সাইফুজ্জামান মানিক এখন পুরোদস্ত কৃষকের বন্ধু। দেশের কৃষি পণ্য কিভাবে বিদেশের মাটিতে নতুন করে পরিচয় করে দেওয়া যায় সে চিন্তায় মগ্ন তিনি। তিনি ইউনিভার্স স্টাইলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক(এমডি) হিসেবে দায়িত্ব পাালনের পাশাপাশি কৃষিপণ্য কিভাবে মান সম্মতভাবে সুন্দর প্যাকেজিং করে বিদেশে পাঠানো যায় তা নিয়েই আছেন। বাগরেহাটে জন্ম নেওয়া মানিকের পাড়াশোনার শুরু সেখানকার বিদ্যালয়েই। এরপর নিজ জেলার কলেজ থেকে ইন্টার পাশ করার পর উচ্চ শিক্ষার জন্য যুক্তরাজ্যের গমণ করেন। সেখানে লন্ডনে তিনি বিজনেস ইনভারমেন্টের উপর বিবিএ ও এমবিএ ডিগ্রী নেন। এর পর তিনি আজ থেকে ৭ বছল আগে দেশে ফিরে এসে টেক্সটাইল সেক্টরের ব্যবসা শুরু করেন । যেটা এখনো বিদ্যমান। পাশাপাশি তিনি দেশীয় কৃষিপণ্য রপ্তারীর দিকে মনোযোগ দেন।এরপর তিনি নতুন নতুন ব্যবসার খোঁজে পৃথিবীর ৩০ টিরও অধিক দেশে ভ্রমণ করেন।
সাইফুজ্জামান মানিক বলেন,‘ প্রায় দেশেই গিয়ে দেখি ওইসব দেশের ফল ও সবজি দেখতে অনেক সুন্দর। আর বাংলাদেশ থেকেও ওইসব দেশে তাজা ফল ও সবজি যায়। কিন্ত আমাদের ওইসব কিনে শুধু আমাদের প্রবাসী বাংলাদেশীরা। অন্য দেশের মানুষরা নানা কারণে আমাদের দেশের পন্য কিনে না। তারমধ্যে; প্যাকেজিং। প্যাকেজিং ভালো না হওয়ার কারণে পণ্যটা যেমন দেখতে সুন্দর হয়না তেমনি প্যাকেজিংটাও তেমন সুন্দরনা। আর দেশ থেকে পাঠানো সবজি ও ফলে এন্টি ফাঙ্গাল মিশ্রিত ফোম নেটগুলো থাকেনা তাই এগুলোর চাহিদা বিদেশী ক্রেতাদের কাছে নেই। এর পর আমি সিদ্ধান্ত নিলাম দেশে এই প্যাকেজিংটা কিভাবে সহজে করা যাায় আর ফোম নেটগুলো ব্যবসায়ী,কৃষকদের নিকট সহজে পৌঁছানো যায় এই চিন্তা থেকেই, ফোম নেট উৎপাদন শুরু করি। দেশে আমরাই একমাত্র ফোন নেট উৎপাদন করি।’
তিনি দুবাইতে রয়েল প্লানেট এলএলসি নামে একটি কোম্পানীও চালান।
তিনি বলেন, ‘ এর পর মাত্র ২ বছর আগে আমি শিপে করে প্রচুর পরিমাণে আসারশ ও আম নেওয়ার চেষ্টা করলাম। তখন ওইসব ফল ও সবজি পাঠাতে দুইবার ফোম আমদানী করি। কারণ এইসব ফোম না থাকার কারণে আমি ভালভাবে প্যাকেজিং করতে পারছিলাম না। এরপর আমি দুই-তিন কোটি টাকা খরচ করে এই ফোম বানানোর মেশিন আমি বাংলাদেশে নিয়ে এসেছি। যাতে আমাদের কৃষিপণ্যর ক্রেতাগুলো যেন প্রবাসী না হয়ে ইন্টারন্যাশনালী সবাই কিনতে পারে।’
তিনি বাংলাদেশের কৃষকদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। বলেন, ‘আমার ব্যবসায় ঢোকার কারণ কিছুটা ভিন্ন। আমাদের কৃষকরা অনেব পরিশ্রম করে অনকে যত্ন করে ফসলটা চাষ করে। কিন্ত তাদের সেই পণ্যর দামটা সঠিকভাবে পায়না আর বিদেশে ভালো বাজার না থাকায় নষ্ট হয়ে যায়। অথচ ভিয়েতনামের কৃষকরা ৬ ঘন্টার বেশি কাজ করেনা।’
তিনি বলেন, ‘আমি কন্ট্রাক্ট ফামিং করিনা কিন্ত আমার কিছু বিশ্বস্ত স্পাপ্লায়ার আছে যারা দেশের সেরা কৃষক বাছাই করে তাদের সেরা ফসলটা সংগ্রহ করে আমাদের হাতে তুলে দেয়। সেই মালামাল আমরা এয়ারক্রাফটে করে গন্তব্যে নিয়ে আসি।’
জানাযায়, বিদেশে কৃষি পণ্য পাঠাতে রপ্তানীকারকদের নানামুখি সমস্যায় পড়তে হয়। সবচেয়ে বড় সমস্যা কাগো পরিবহণ না থাকা। একারণে তাদের প্যাসেঞ্জার এয়ারক্রাফটে পাঠাতে হয়। তিনি আক্ষেপ করে বলেন, ‘দেশের সেরা কৃষকের সেরা ফসলটা আমরা হাতে পেলেও তা চাইলেই নিদিষ্ট দেশে পাঠানো সম্ভব হয়না। কারণ যোগাযোগ ব্যবস্থা। আমাদের তো কাগো শিপের ব্যবস্থা নেই আছে এয়ারক্রাফট। সো এয়াক্রাফটগুলোতে সাধারণত ৮০০-১০০০ কেজির বেশি পন্য পরিবহনের সুযোগ থাকেনা। তাই চাইলেও আমরা দেশের কৃষি পণ্য পাঠাতে পারিনা ।‘
তিনি আরো বলেন,‘এইসব এয়ারক্রাফটে ভাড়া অনেক বেশি, এছাড়া পণ্য রাখার জন্য কোল্ড স্টোরেজ ফ্যাসিলিটি অপ্রুতুল। অথচ, অনান্য দেশ যারা কৃষিপণ্য রপ্তানী করে তাদের দেশে যেদিনই লোডিং হচ্ছে সেদিনই অথবা এক বা দুই দিনের মধ্যে এয়ারক্রাফটগুলো চলে যাচ্ছে। কিন্ত, আমাদের দেশে সিএন্ডএফ এজেন্টরা বলে মিনিমাম চার-পাঁচ দিন বা এক সপ্তাহ আগে এইটা(কৃষিপণ্য) পৌঁছাতে হবে। অথাৎ আমি কোন কৃষি পণ্য সংগ্রহ করার পর প্রায় সপ্তাহ খানেক তাদের ওয়ার হাউজে বা কন্টেইনারে রেখে দিতে হয়। আবার আমি যে কন্টেইনারে কৃষিপন্য রাখছি সেখানে এক সাথে অনান্য পণ্যও থাকে। কিন্ত বাইরের দেশগুলোতে পেরিশেবল আইটেমগুলো একটা আলাদা কন্টেইনারে রাখা হয় যেদিন জাহাজ ছাড়বে সেদিন তারা নিয়ে নেয়।’
তিনি আশা করেন, সরকার এ দিকে পদক্ষেপ নিবেন। কৃষি পণ্য প্যারিশেবল আইটেমগুলো রপ্তানীর ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার যেন পায়। আর আলাদা কুলিং কন্টেইনারে দেওয়া হয়। যাতে পণ্যর মান ঠিক থাকে। তিনি আরো বলেন, ‘বতমানে আমার ভিয়েতনামে ব্যবসা আছে আবার দুবাইতেও একটি রিটেল শপ খুলেছি।’
সম্প্রতি ‘বাংলাদেশের কৃষিক্ষেত্রে রপ্তানির সম্ভাবনা, সুযোগ, চ্যালেঞ্জ ও ব্র্যান্ডিং কৌশল’ শীর্ষক সেমিনারে বলা হয়; প্রতি বছর বাংলাদেশের উৎপাদিত শাক-সবজির ২০ থেকে ৪৪ শতাংশ অপচয় হওয়া। এই অপচয়ের কারণে বছরে বাংলাদেশ ২.৪ বিলিয়ন ডলার আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে।
বলাহয়, দেশে শাক-সবজি, ফুল ও ফলের বাজার সম্প্রসারিত হলেও সেই সম্ভবনাকে কাজে লাগানো যাচ্ছেনা। উৎপাদন কাঠামো ও ব্যবস্থাপনাগত দুর্বলতার কারণে চীন, থাইল্যান্ড, ভিয়েতনামের তুলনায় এ খাতে রপ্তানিতে বাংলাদেশ অনেক পিছিয়ে। এ অবস্থায় রপ্তানি বাড়াতে তরুণদের কৃষি কাজে সম্পৃক্ততা বাড়ানো, সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব ও সমন্বিত উদ্যোগ জরুরি।







