এবারের কপ সম্মেলনে ধনী দেশগুলোর অর্থায়নের ধীরগতি এবং জটিলতা যেন এক অদৃশ্য শৃঙ্খল, যা বৈশ্বিক তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ থেকে শুরু করে অভিযোজন প্রক্রিয়া সব কিছুকেই হুমকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে।
সেই সাথে জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলায় অর্থ প্রবাহ যেন সেই রক্তস্রোত, যা ছাড়া সব চেষ্টা অচল হয়ে পড়বে এমনই সতর্কবাণী শোনালেন জাতিসংঘের ফ্রেমওয়ার্ক কনভেনশন অন ক্লাইমেট চেঞ্জের (ইউএনএফসিসিসি) নির্বাহী সচিব সাইমন স্টিল।
বিশেষ করে দরিদ্র দেশগুলোতে অভিযোজনের জন্য অর্থের অভাব যেন এক গভীর খাদ, যা ক্রমেই গভীর থেকে গভীরতর হচ্ছে। জলবায়ু পরিবর্তনের আঘাত যত তীব্র হচ্ছে, ততই এই দেশগুলো প্রয়োজনীয় সাহায্য থেকে দূরে সরে যাচ্ছে।
গতকাল কপ৩০-এর তৃতীয় উচ্চপর্যয়ের মন্ত্রিসভা-সম্পর্কিত সংলাপে স্টিলের কণ্ঠে ফুটে উঠল গভীর উদ্বেগ। তার ভাষায়, জলবায়ু অর্থায়নই সেই প্রাণশক্তি, যা ছাড়া কোনো কার্যক্রমই চলতে পারে না। এই অর্থপ্রবাহের ওপরই নির্ভর করে দেশগুলোর বাস্তব উন্নয়ন পদক্ষেপ, নীতির রূপায়ণ এবং অভিযোজনের সাফল্য। প্যারিস চুক্তির পর গত দশকে আন্তর্জাতিক জলবায়ু সহযোগিতা অবশ্যই এগিয়েছে, সরকারি-বেসরকারি বিনিয়োগ বেড়েছে, নতুন অংশীদারত্ব গড়ে উঠেছে, উন্নয়নশীল দেশগুলোতে পরিচ্ছন্ন জ্বালানি এবং ন্যায়সংগত রূপান্তরের জন্য অর্থের প্রবাহও কিছুটা বেড়েছে। কিন্তু এই অগ্রগতি প্রকৃত প্রয়োজনের তুলনায় নিতান্তই অপর্যাপ্ত। যেন বিশাল মরুভূমিতে এক ফোঁটা জল।
স্টিলের কথায়, তহবিলে ডলার আসছে ঠিকই, কিন্তু তা অনির্ভরযোগ্য অপর্যাপ্ত এবং অনেক ক্ষেত্রে ন্যায়সংগত বণ্টনের অভাবে ব্যর্থ হচ্ছে। উন্নত দেশগুলো ২০১৯ সালের তুলনায় ২০২৫ সালের মধ্যে অভিযোজন তহবিল দ্বিগুণ করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল বটে, কিন্তু এখন সেই প্রতিশ্রুতি মূল্যায়নের সময় এসেছে। তার জোরালো কথা, এখনই অর্থ ছাড় ত্বরান্বিত না করলে অভিযোজনে আরও কঠিন হয়ে উঠবে। এই লক্ষ্য পূরণে জাতিসংঘের জলবায়ু সংস্থা ইউএনএফসিসিসির অধীনে থাকা তিনটি গুরুত্বপূর্ণ তহবিল অ্যাডাপটেশন ফান্ড, এলডিসি ফান্ড এবং স্পেশাল ক্লাইমেট ফান্ড থেকে ২০৩০ সালের মধ্যে অর্থ ছাড় তিনগুণ করার আহ্বান জানান তিনি।
স্টিলের বক্তব্য স্পষ্ট, এই তহবিলগুলো কোনো সংখ্যার খেলা নয়, এগুলো ছোট দ্বীপরাষ্ট্রের বেঁচে থাকার লড়াই, কৃষিনির্ভর দেশগুলোর খাদ্যনিরাপত্তা এবং উদীয়মান অর্থনীতির ন্যায়সংগত জ¦ালানি রূপান্তরের মূলস্তম্ভ। উন্নয়নশীল বিশ্বের চ্যালেঞ্জগুলোকে তুলে ধরে তিনি বলেন, উচ্চ ঋণের বোঝা, মূলধনের অস্বাভাবিক ব্যয় এবং সংকুচিত আর্থিক সক্ষমতার কারণে অনেক দেশ প্রতিশ্রুত অর্থও সময়মতো পাচ্ছে না। এমন অবস্থায় সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন তিনি।
সহজ শর্তে স্বল্প সুদের অর্থায়ন বাড়ানো, অনুদানভিত্তিক তহবিলের প্রসার, লেনদেনের ব্যয় কমানো, পদ্ধতিগত বাধা দূরীকরণ, ঝুঁকি ভাগাভাগির নতুন মডেল এবং জলবায়ু বিনিয়োগের বিনিময়ে ঋণ রেয়াতের মতো উদ্ভাবনী পদ্ধতি ছাড়া ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলো জলবায়ু অভিযোজন ও প্রশমনের পরিকল্পনা এগিয়ে নিতে পারবে না, বলেন স্টিল। তার আহ্বান, জলবায়ু অর্থায়নকে কখনো দান বা সহানুভূতি হিসেবে না দেখে, ধনী দেশগুলো এটিকে স্মার্ট অর্থনীতির অংশ বলে মনে করা উচিত। কারণ, পরিচ্ছন্ন জ্বালানি, স্থিতিস্থাপক অবকাঠামো এবং সবুজ কর্মসংস্থান এসবই বৈশ্বিক অর্থনীতির আগামী প্রবৃদ্ধির মূল চালিকা। তাই এতে বিনিয়োগ মানে দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতার ভিত গড়া।
বৈশ্বিক নেতাদের উদ্দেশে তার কথা, অর্থায়নের গতি ও স্বচ্ছতা বাড়লে দেশগুলোর মধ্যে আস্থা বাড়বে, আর সেই আস্থা থেকেই বাস্তব অর্থনীতিতে দ্রুত রূপায়ণ সম্ভব। এ বছরের কপ৩০-কে ‘পরীক্ষার মুহূর্ত’ বলে উল্লেখ করে তিনি সতর্ক করেন, বিশ্বের চোখ এখন বাস্তব ফলাফলের দিকে। জলবায়ু নীতি নয়, বাস্তব অর্থায়নই প্রমাণ করবে যে, প্যারিস চুক্তির চেতনা আজও জীবন্ত। তার কথায়, অর্থ যখন প্রবাহিত হয়, তখন উচ্চাকাক্সক্ষা বাড়ে; আর উচ্চাকাক্সক্ষা বাড়লে বাস্তবায়নও এগোয় এটাই জলবায়ু সমীকরণ।
শেষ আহ্বানে তিনি বলেন, নিশ্চিত করুন যে, জলবায়ু অর্থায়ন হবে পূর্বানুমানযোগ্য, স্বচ্ছ এবং উন্নয়নশীল দেশের প্রয়োজনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। তাহলেই প্যারিস চুক্তির প্রতিশ্রুতি পূরণ হবে, আর নিরাপদ ভবিষ্যতের পথে সত্যিকারের অগ্রগতি সম্ভব হবে।






