নাজমুন নাহার বাংলাদেশের লাল-সবুজের পতাকাবাহী প্রথম বিশ্বজয়ী পরিব্রাজক এবং বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ নারী পরিব্রাজক হিসেবে ১৮৫টি দেশ ভ্রমণের গৌরবময় রেকর্ড অর্জন করেছেন। ৭ আগস্ট ভুটান অভিযাত্রার মাধ্যমে তিনি বিশ্বভ্রমণের ১৮৫তম দেশের মাইলফলক অর্জন করেন। ২৬ বছর ধরে এককভাবে বিশ্বের একের পর এক দেশ ভ্রমণ করে তিনি বাংলাদেশের লাল-সবুজের পতাকাকে বিশ্বমঞ্চে তুলে ধরেছেন। একজন বাংলাদেশি নারী হিসেবে সৃষ্টি করেছেন অনবদ্য ও দুঃসাহসিক ইতিহাস।
পৃথিবীর মানচিত্রে ছড়িয়ে থাকা পাহাড়, পর্বত, মরুভূমি, সমুদ্র, মহাসাগর, দ্বীপ, দুর্গম সীমান্ত, প্রাকৃতিক বিস্ময় ও ঐতিহাসিক স্থাপনা—এমন ১ হাজার ২৯৪টিরও বেশি স্থানে বাংলাদেশের লাল-সবুজের পতাকা বহন ও উত্তোলন করেছেন নাজমুন নাহার। ২৬ বছরের দীর্ঘ বিশ্বভ্রমণে তিনি শুধু এক দেশ থেকে আরেক দেশে যাননি; সঙ্গে নিয়ে গেছেন বাংলাদেশকে। তার হাতে থাকা লাল-সবুজের পতাকা হয়ে উঠেছে বাংলাদেশের স্বাধীনতা, আত্মপরিচয়, সংস্কৃতি, শান্তি ও মানুষের প্রতি ভালোবাসার শক্তিশালী প্রতীক।
নাজমুন নাহারের বিশ্বভ্রমণের গল্প শুরু হয়েছিল শৈশব থেকেই। বাংলাদেশের লক্ষ্মীপুরে বেড়ে ওঠা নাজমুনের পৃথিবী, মানুষ, প্রকৃতি ও অজানা জায়গার প্রতি ছিল গভীর আকর্ষণ। তার বাবা মোহাম্মদ আমিন ও মা তাহেরা আমিন ছোটবেলা থেকেই তাকে বই পড়তে উৎসাহিত করতেন। বিশ্বের বিভিন্ন স্থানের গল্প শোনাতেন। পরিবার ও বই ছিল তার জ্ঞান ও কল্পনার অন্যতম বড় উৎস।
বিশ্বভ্রমণের পাশাপাশি নাজমুন নাহার উচ্চশিক্ষার পথেও এগিয়েছেন। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ থেকে অনার্স ও মাস্টার্স পড়াশোনা শেষ করার পর স্কলারশিপ নিয়ে সুইডেনের লুন্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে উচ্চশিক্ষার সুযোগ পান। সেখানে এশিয়ান স্টাডিজ বিষয়ে অধ্যয়ন শেষ করেন। পরে দক্ষিণ কোরিয়ার সিউল ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটিতে হিউমান রাইটস ও এশিয়া বিষয়ে আরেকটি স্কলারশিপ প্রোগ্রামের উচ্চতর ডিগ্রি অর্জন করেন। এ ছাড়া সুইডেনের বিভিন্ন ইনস্টিটিউট থেকে ছয়টি প্রফেশনাল ডিপ্লোমা ডিগ্রি অর্জন করেন। তার একাডেমিক গবেষণা ছিলো সেকেন্ড জেনারেশন বাই কালচারালিজমের ওপর আমেরিকা ও সুইডেনে। তার শিক্ষা ও গবেষণার অভিজ্ঞতা বিশ্বভ্রমণের সামাজিক ও মানবিক দৃষ্টিভঙ্গিকে আরও সমৃদ্ধ করেছে। তিনি সুইডওয়াচসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থায় কাজ করেছেন গবেষক হিসেবে।
২০০০ সালে ভারতের পাঁচমারিতে অনুষ্ঠিত ইন্ডিয়া ইন্টারন্যাশনাল অ্যাডভেঞ্চার প্রোগ্রামে অংশগ্রহণের মাধ্যমে বাংলাদেশের জাতীয় পতাকা হাতে নাজমুন নাহারের আন্তর্জাতিক অভিযাত্রার সূচনা হয়। তার কাছে বিশ্বভ্রমণ কখনোই শুধু পর্যটন ছিল না। তার অভিযাত্রার কেন্দ্রে ছিল বাংলাদেশের জাতীয় পতাকা এবং বাংলাদেশের পরিচয়কে বিশ্বের মানুষের কাছে তুলে ধরা।
নো ওয়ার অনলি পিস, সেভ দ্য প্লানেট, স্টপ চাইল্ড ম্যারেজ—বার্তাগুলো তার বিশ্বভ্রমণের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে। পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে গিয়ে তিনি বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাস, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও জাতীয় পরিচয়ের কথা বলেছেন। একই সঙ্গে তিনি শান্তি, মানবাধিকার, নারী ও শিশুর অধিকার, পরিবেশ ও জলবায়ু রক্ষার বিষয়ে সচেতনতা তৈরির চেষ্টা করেছেন। তার ভ্রমণ তাই ধীরে ধীরে একটি ব্যক্তিগত স্বপ্নের সীমা ছাড়িয়ে সামাজিক ও মানবিক বার্তাবাহী অভিযাত্রায় পরিণত হয়েছে।
২০১৮ সালের ১ জুন নাজমুন নাহার তার বিশ্বভ্রমণের ১০০তম দেশের মাইলফলক অর্জন করেন জিম্বাবুয়েতে। জাম্বিয়া থেকে স্থলপথে জিম্বাবুয়েতে প্রবেশ করে তিনি ভিক্টোরিয়া জলপ্রপাত এলাকায় বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন করেন। সেই মুহূর্তে লাল-সবুজের পতাকা নিয়ে তার ১০০ দেশের স্বপ্ন বাস্তব রূপ নেয়।
অবশেষে চলতি বছরের ৭ আগস্ট। হিমালয়ের কোলে অবস্থিত ভুটানে বাংলাদেশের লাল-সবুজের পতাকা হাতে পৌঁছে অর্জন করেন ১৮৫তম দেশের মাইলফলক। ভুটানের পাহাড়ি ভূপ্রকৃতির মাঝে বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলনের মাধ্যমে ২৬ বছরের দীর্ঘ অভিযাত্রা পৌঁছে যায় এক নতুন ঐতিহাসিক অধ্যায়ে।
নাজমুন নাহারের বিশ্বভ্রমণের তাৎপর্য শুধু ১৮৫টি দেশের সংখ্যায় নয়। ২৬ বছরের অভিযাত্রায় তিনি বাংলাদেশের লাল-সবুজের পতাকা নিয়ে গেছেন ১ হাজার ২৯৪টিরও বেশি স্থানে—উঁচু পর্বত থেকে মরুভূমি, সমুদ্র থেকে দ্বীপ এবং প্রাকৃতিক বিস্ময় থেকে ঐতিহাসিক স্থাপনায়। তার ভ্রমণপদ্ধতিতেও ছিল ভিন্নতা। স্থলবেষ্টিত দেশগুলোতে তিনি সড়কপথ এবং সামুদ্রিক দেশগুলোতে সমুদ্রপথকে অগ্রাধিকার দিয়েছেন। প্রয়োজন ছাড়া বিমান ব্যবহার না করে দীর্ঘ ও দুর্গম পথ পাড়ি দিয়ে একের পর এক দেশের সীমান্ত অতিক্রম করেছেন।







