দেশে টানা দুই বছর আলুর উদ্বৃত্ত উৎপাদন হলেও বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধি, ব্যাংক ঋণের সুদের হার এবং আনুষঙ্গিক পরিচালন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় গভীর আর্থিক সংকটের মুখে পড়েছে হিমাগার (কোল্ড স্টোরেজ) শিল্প। সরকার নির্ধারিত বর্তমান ভাড়ায় হিমাগার পরিচালনা করা আর সম্ভব হচ্ছে না জানিয়ে দ্রুত ভাড়া যৌক্তিকভাবে পুনর্নির্ধারণের দাবি জানিয়েছে বাংলাদেশ কোল্ড স্টোরেজ অ্যাসোসিয়েশন। শনিবার (১ আগস্ট) রাজধানীতে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে সংগঠনের সভাপতি মোস্তফা আজাদ চৌধুরী বাবু এই তথ্য ও দাবি তুলে ধরেন।
সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, ২০২৫ সালে দেশে ১ কোটি ১৫ লাখ মেট্রিক টন এবং ২০২৬ সালে ১ কোটি ১২ লাখ মেট্রিক টন আলু উৎপাদিত হয়েছে; যা দেশের বার্ষিক চাহিদার (প্রায় ৯০-৯৫ লাখ টন) তুলনায় যথাক্রমে ২৫ লাখ ও ২২ লাখ টন বেশি। বর্তমানে দেশের ৩৫১টি হিমাগারে প্রায় ৩৪ লাখ মেট্রিক টন আলু সংরক্ষিত রয়েছে।
অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি বলেন, ২০২৫ সালে সরকার প্রতি কেজি আলু সংরক্ষণের সর্বোচ্চ ভাড়া ৬ টাকা ৭৫ পয়সা নির্ধারণ করেছিল। তবে ২০২৬ সালের ১ জুন থেকে বিদ্যুতের বাণিজ্যিক ট্যারিফ ১৮ শতাংশ বাড়ানো হয়েছে। পাশাপাশি শ্রমিকের মজুরি, লুব্রিকেন্ট, অ্যামোনিয়া গ্যাস ও যন্ত্রাংশের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। একটি ১০ হাজার টন ধারণক্ষমতার হিমাগারে কেবল ব্যাংক ঋণ ও বিদ্যুৎ বিল বাবদ প্রতি কেজিতে খরচ হয় ৭ টাকা ১১ পয়সা। অন্যান্য পরিচালন ব্যয় যোগ করলে বর্তমানে প্রতি কেজি আলু সংরক্ষণের প্রকৃত খরচ দাঁড়িয়েছে ৯ টাকা ৬২ পয়সা। ফলে নির্ধারিত ভাড়ায় হিমাগার চালিয়ে মালিকরা নিয়মিত ব্যাংক ঋণের কিস্তি শোধ করতে না পেরে ঋণখেলাপির ঝুঁকিতে পড়ছেন।
পরিস্থিতি উত্তরণে হিমাগার মালিকরা সরকারের কাছে ৬ দফা দাবি ও সুপারিশ পেশ করেছেন। এর মধ্যে রয়েছে:
-
আলুচাষিদের জন্য বিশেষ প্রণোদনা এবং ব্যক্তিমালিকানাধীন হিমাগারকে কৃষিভিত্তিক শিল্প হিসেবে গণ্য করা।
-
হিমাগারের বিদ্যুৎ বিলে ২০ শতাংশ রিবেট (ছাড়) প্রদান।
-
কম সুদে দীর্ঘমেয়াদি ঋণের ব্যবস্থা ও কিস্তি পরিশোধে বিশেষ সুবিধা।
-
উদ্বৃত্ত আলু রপ্তানিতে প্রণোদনা ১০ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৩০ শতাংশ করা।
-
ভাড়া নির্ধারণী কেন্দ্রীয় কমিটিতে চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট বা আর্থিক বিশেষজ্ঞ অন্তর্ভুক্ত করা।
ক্রপ জোনিং ম্যাপিংয়ের আহ্বান:
উৎপাদন ও চাহিদার সামঞ্জস্য রাখতে দেশে ‘ক্রপ জোনিং ম্যাপিং’ চালুর দাবি জানিয়েছে সংগঠনটি। কৃষিপণ্যের বেশি উৎপাদনের ফলে সৃষ্ট লোকসান এড়াতে কোন অঞ্চলে কী পরিমাণ আলু চাষ হবে, তা কৃষি মন্ত্রণালয় থেকে নির্ধারণের পরামর্শ দেওয়া হয়।
বিষয়টি সমর্থন করে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিলের (বিএআরসি) কৃষি অর্থনীতি ও গ্রামীণ সমাজবিজ্ঞান বিভাগের সদস্য পরিচালক (চলতি দায়িত্ব) ড. মোঃ মোশাররফ উদ্দিন মোল্লা জানান, প্রযুক্তিগত উদ্ভাবনে গবেষণা প্রতিষ্ঠান কাজ করছে এবং ‘খামারি’ অ্যাপের মাধ্যমে এ কাজ শুরু হয়েছে। তবে তা মাঠপর্যায়ে বাস্তবায়নে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরকে (ডিএই) আরও কার্যকর ভূমিকা রাখতে হবে।
হিমাগার শিল্পকে টিকিয়ে রাখা কৃষক ও খাদ্য নিরাপত্তার স্বার্থেই জরুরি উল্লেখ করে দ্রুত গ্রহণযোগ্য সমাধানের আহ্বান জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।







