
রাজশাহীতে বেপরোয়া হয়ে উঠেছেন স্বেচ্ছাসেবক দল নেতা মনিরুজ্জামান শান্ত। তিনি রাজশাহী মহানগরীর বোয়ালিয়া (পশ্চিম) থানা স্বেচ্ছাসেবক দলের আহ্বায়ক। তার বিরুদ্ধে এক বছর আগে পূজামণ্ডপে হামলার মতো গুরুতর অভিযোগ ওঠে।
ওই ঘটনার পর থানা ঘেরাও করে মামলা করেছিলেন হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকজন। কিন্তু তখন শান্তর বিরুদ্ধে কোনো সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। এবার এই নেতার বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে জনসমম্মুখে বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া এক তরুণীকে ধর্ষণের হুমকি দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে।
কিন্তু এবারও কোনো ব্যবস্থা না নিয়ে উল্টো তার পক্ষেই সাফাই গাইছেন রাজশাহী মহানগর স্বেচ্ছাসেবক দলের নেতারা। মনিরুজ্জামান শান্তর বাড়ি মহানগরীর বোয়ালিয়া থানার বড়কুঠি এলাকায়।
রাজশাহীর একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থীর (২৩) অভিযোগ, গত শনিবার (৪ মার্চ) সন্ধ্যায় শান্ত প্রকাশ্যেই তাকে ধর্ষণের হুমকি দিয়েছেন। প্যান্টের চেইন খুলে তিনি করেছেন আশালীন আচরণ। এ নিয়ে রোববার সকালে থানায় মামলা করেছেন তিনি।
এ ব্যাপারে গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশ হলে বিবৃতি দিয়ে প্রতিবাদ জানিয়েছে মহানগর স্বেচ্ছাসেবক দল। মহানগর স্বেচ্ছাসেবক দলের সিনিয়র সদস্য সৈকত পারভেজ স্বাক্ষরিত বিবৃতিতে বলা হয়েছে, রাজনৈতিক প্রতিহিংসার জের ধরে সামাজিক ও রাজনৈতিক মহলে মনিরুজ্জামান শান্তর বিরুদ্ধে মিথ্যা ভিত্তিহীন বানোয়াট তথ্য গণমাধ্যমে অপপ্রচারের তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছেন মহানগর স্বেচ্ছাসেবক দলের আহবায়ক মীর তারেক ও সদস্য সচিব আসাদুজ্জামান জনি।
ভুক্তভোগী ওই তরুণী মামলার এজাহারে বলেছেন, গত শনিবার সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার দিকে তিনি ও তার একজন বন্ধু বড়কুঠি পদ্মারপারে আয়োজিত রাজশাহী লিটারারি ফেস্টিভ্যাল দেখতে যান। তার বন্ধু সেখানে মোটরসাইকেল রাখতেই এক ব্যক্তি বাইক রাখার টিকিট দিতে যান। তারা জানতে চান, এখানে কী কারণে গ্যারেজের টিকিট দেওয়া হচ্ছে। তখন তাদের অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করা হয়। এ অবস্থায় তারা ঝামেলা না করে চলে যেতে চাইলে আসামি শান্ত তার প্যান্টের চেইন খুলে বাজে অঙ্গভঙ্গি ও ইঙ্গিত করেন। একপর্যায়ে বলেন, ‘তোকে এখানেই ধর্ষণ করব। কেউ আমার কিছু করতে পারবে না।’
এই ঘটনার পর ভুক্তভোগী শিক্ষার্থী বোয়ালিয়া থানায় গিয়ে লিখিত অভিযোগ দেন। পরে পুলিশ ঘটনাস্থলে গেলে পুলিশের সামনেই ওই তরুণীকে আবারও কটুক্তি করা হয়। একপর্যায়ে পুলিশ সেখান থেকে ফিরে যায়। এরপর অভিযুক্তদেরও থানায় ডাকা হয়। তখন মহানগর স্বেচ্ছাসেবক দলের আহ্বায়ক মীর তারেকসহ ২০-২৫ জন নেতাকর্মী এবং সঙ্গে নিয়ে থানায় যান শান্ত।
থানায় ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার (ওসি) কক্ষেও ওই তরুণীকে আপত্তিকর কথা বলা হয়। তরুণী তখন মামলা করতে চাইলেও পুলিশ নেয়নি। পরে তরুণীকে নিরাপদে থানা থেকে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। পরে স্বেচ্ছাসেবক দলের নেতাকর্মীরাও চলে যান। পর দিন সকালে ওই তরুণীকে থানায় ডেকে মামলা রেকর্ড করে পুলিশ। মামলায় মনিরুজ্জামান শান্ত, তার ভাই মো. শুভসহ অজ্ঞাত তিন-চারজনকে আসামি করা হয়।
তবে একদিন পরও আসামিদের কাউকেই গ্রেফতার করতে পারেনি পুলিশ। এর আগে স্বরস্বতীপূজার মণ্ডপে হামলার ঘটনায় গত বছরের ৫ ফেব্রুয়ারি মামলা হলেও পুলিশ কাউকে গ্রেফতার করেনি। শান্তসহ মোট ১০ জনের বিরুদ্ধে মামলাটি করেছিলেন হিন্দু-বৌদ্ধ কল্যাণ ফ্রন্টের মহানগরের সাধারণ সম্পাদক অশোক কুমার সাহা।
অভিযোগে বলা হয়েছিল, ফুদকিপাড়া এলাকার মন্নুজান স্কুল মাঠে সপ্তসতী ও আশীর্বাদ সংঘের উদ্যোগে সরস্বতী পূজার আয়োজন করা হয়েছিল। ৪ ফেব্রুয়ারি রাতে সনাতনী যুবকেরা গানবাজনার সঙ্গে নাচানাচি করছিল। তখন হামলাকারী যুবকেরা তাদের সঙ্গে এসে নাচানাচি শুরু করে। একপর্যায়ে তারা অতর্কিতভাবে লাঠিসোটা নিয়ে তাদের ওপর হামলা করে এবং প্যান্ডেল ও সাউন্ডবক্স ভাঙচুর করে। হামলাকারীরা মেয়েদেরও মারধর করে। পরে টহল পুলিশ ও স্থানীয় লোকজন এগিয়ে গেলে তারা গালাগাল ও প্রাণনাশের হুমকি দিয়ে পালিয়ে যায়।
তবে মামলা দায়েরের একবছর পরও এ বিষয়ে কোনো অগ্রগতি নেই। পুলিশ কাউকে গ্রেফতারও করেনি। অভিযুক্ত মনিরুজ্জামান শান্ত বলছেন, গতবছর মণ্ডপে হামলার সময় তিনি তা ঠেকাতে গিয়েছিলেন। ভুল করে তাকে আসামি করা হয়েছিল। তাই বিষয়টি ওভাবেই আছে। আর ধর্ষণের হুমকির অভিযোগে এবার যে তরুণী মামলা করেছেন তাকে ধর্ষণের কোনো হুমকি দেওয়া হয়নি। তাকে আমি দেখিওনি। গ্যারাজে পার্কিংয়ের টাকা দিতে না চাইলে শুধু তর্ক-বিতর্ক হয়েছে।
মণ্ডপে হামলার মামলাটি তদন্ত করছেন বোয়ালিয়া থানার উপপরিদর্শক (এসআই) শরিফুল ইসলাম। তিনি জানান, মামলাটি তদন্তাধীন অবস্থায় আছে। কোনো আসামিকে গ্রেফতার করা যায়নি। তিনি এ বিষয়ে মোবাইল ফোনে কথা বলতে অপারগতা প্রকাশ করে বলেন, সাক্ষাতে বিস্তারিত বলবেন।
যোগাযোগ করা হলে এই মামলার বাদী অশোক কুমার সাহা বলেন, তদন্ত কর্মকর্তা তার সঙ্গে কোনোদিন যোগাযোগই করেননি। মামলাটি কী পর্যায়ে আছে সেটিও তিনি জানেন না।
এবার তরুণীকে ধর্ষণের হুমকির অভিযোগে মামলা হলেও শান্তকে গ্রেফতার করতে পারেনি পুলিশ। জানতে চাইলে বোয়ালিয়া থানার ওসি রবিউল ইসলাম বলেন, ‘আগের মামলার বিষয়ে আমি জানি না। তখন আমি ছিলাম না। এবারের মামলার বিষয়টি জানি। তাকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না।’
আসামির মোবাইল ফোন চালু থাকার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘ফোন খোলা থাকলেও অনেক সময় লোকেশনে পাওয়া যায় না। তাই গ্রেফতার করা যাচ্ছে না।’
পুলিশের ভাষ্য, প্রাথমিক তদন্তে ওই তরুণীর অভিযোগের সত্যতা মিলেছে। তারপরও অভিযুক্ত শান্তর বিরুদ্ধে কোনো সাংগঠনিক ব্যবস্থা না নিয়ে উল্টো তার পক্ষেই সাফাই গাইছে মহানগর স্বেচ্ছাসেবক দল।
জানতে চাইলে মহানগর স্বেচ্ছাসেবক দলের আহ্বায়ক মীর তারেক বলেন, ‘গ্যারেজে ১০ টাকা না দেওয়া নিয়ে ঘটনা। ঘটনাটা এত বড় না, যতটা মামলার এজাহারে বলা হয়েছে।’
মণ্ডপে হামলার মামলা হলেও শান্তর বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা না নেওয়ার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘আমরা এখনকার ঘটনা নিয়ে কথা বলছি। একবছর আগের কথা কেন বলব? এই প্রশ্নটা তখন করতে হতো। এ বিষয়ে আমি এখন কিছু বলতে চাচ্ছি না।’







