পুঁজিবাজারে ব্রোকারেজ হাউসগুলোর অনিয়ম ও বিনিয়োগকারীদের অর্থ আত্মসাৎ ঠেকাতে আকস্মিক পরিদর্শনের উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)। এ জন্য আট সদস্যের একটি স্থায়ী যৌথ পরিদর্শন কমিটি গঠনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। কমিটিতে বিএসইসি, ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই), চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জ (সিএসই) ও সেন্ট্রাল ডিপোজিটরি বাংলাদেশ লিমিটেডের (সিডিবিএল) দুজন করে প্রতিনিধি থাকবেন।
কমিটির সদস্য মনোনয়নের জন্য ইতোমধ্যে সংশ্লিষ্ট চার প্রতিষ্ঠানের কাছে পৃথক চিঠি পাঠিয়েছে বিএসইসি। এই কমিটি স্টক ব্রোকার ও স্টক ডিলারদের কার্যালয়ে সরেজমিনে আকস্মিক পরিদর্শন করবে। এর মাধ্যমে কনসোলিডেটেড কাস্টমার্স অ্যাকাউন্ট (সিসিএ), গ্রাহকের শেয়ার ও অর্থ, নিয়ন্ত্রক বিধিবিধান এবং মার্জিন ঋণসহ সংশ্লিষ্ট কার্যক্রম যাচাই করা হবে।

পুঁজিবাজারে ব্রোকারেজ হাউসগুলোর অনিয়ম ও বিনিয়োগকারীদের অর্থ আত্মসাৎ ঠেকাতে আকস্মিক পরিদর্শনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে বিএসইসি। সম্প্রতি সাতটি ব্রোকারেজ হাউসে ভুয়া ব্যাক-অফিস সফটওয়্যার ব্যবহার ও সিসিএ থেকে প্রায় ৪৫ হাজার বিনিয়োগকারীর ৫৬৩ কোটি ২২ লাখ টাকা আত্মসাতের তথ্য উঠে আসে। এই অনিয়ম প্রতিরোধেই বিএসইসি, ডিএসই, সিএসই ও সিডিবিএলের সমন্বয়ে ৮ সদস্যের স্থায়ী যৌথ পরিদর্শন কমিটি গঠিত হচ্ছে
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে কয়েকটি ব্রোকারেজ হাউসে ভুয়া বা ডুপ্লিকেট ব্যাক-অফিস সফটওয়্যার ব্যবহার, গ্রাহকের অজান্তে শেয়ার বিক্রি এবং সিসিএর অর্থ সরিয়ে নেওয়ার মতো গুরুতর অনিয়মের তথ্য সামনে আসার পর এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হলো।
ডিএসইর সাম্প্রতিক পরিদর্শন প্রতিবেদন অনুযায়ী, সাতটি ব্রোকারেজ হাউসের বিরুদ্ধে প্রায় ৪৫ হাজার বিনিয়োগকারীর ৫৬৩ কোটি ২২ লাখ টাকা ও শেয়ার আত্মসাতের অভিযোগ পাওয়া গেছে। প্রতিবেদনে মোট ঘাটতির পরিমাণ ৬৫০ কোটি টাকার বেশি বলেও উল্লেখ করা হয়েছে।

এমন পরিস্থিতির মধ্যে গত সোমবার ডিএসই ব্রোকার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ডিবিএ) আয়োজিত ‘বাংলাদেশের পুঁজিবাজারের বর্তমান অবস্থা ও উত্তরণের পথ’ শীর্ষক এক উন্মুক্ত আলোচনায় বিএসইসির চেয়ারম্যান মাসুদ খান ব্রোকারেজ হাউসের ওপর নজরদারি বাড়ানোর কথা জানান। তিনি বলেন, ব্রোকারদের নানা ধরনের সমস্যা থাকতে পারে। এর মধ্যে কিছু নিয়মনীতি সংক্রান্ত, আবার কোনো কোনো ক্ষেত্রে কনসোলিডেটেড কাস্টমার্স অ্যাকাউন্টে (সিসিএ) ঘাটতি থাকে, যা বছরের পর বছর ধরে জমে থাকতে পারে।
তার মতে, এ ধরনের অনিয়ম ঠেকাতে ঝুঁকিভিত্তিক পদ্ধতি অনুসরণ করে আকস্মিক পরিদর্শন চালানো প্রয়োজন। অতীতে কোনো কোনো ক্ষেত্রে সিসিএতে ঘাটতি শনাক্ত হওয়ার পর অর্থ ফেরত দেওয়া হয়েছে, কিন্তু পরে সেই অর্থ আবার তুলে নেওয়া হয়েছে। এ ধরনের পরিস্থিতি ঠেকাতে বিএসইসি ও ডিএসই নিয়মিত আকস্মিক পরিদর্শনে একমত হয়েছে।

যেভাবে অতীতে অর্থ আত্মসাৎ হয়েছে
ডিএসইর পরিদর্শনে উঠে আসা তথ্য অনুযায়ী, জালিয়াতির অন্যতম প্রধান কৌশল ছিল নিয়ন্ত্রক সংস্থার অনুমোদিত ব্যাক-অফিস সফটওয়্যারের পরিবর্তে ভুয়া বা ডুপ্লিকেট সফটওয়্যার ব্যবহার করা। এর মাধ্যমে ডিএসই ও বিনিয়োগকারীদের কাছে এক ধরনের তথ্য দেখানো হলেও প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব ব্যবস্থায় রাখা হতো ভিন্ন তথ্য। ফলে প্রকৃত হিসাব গোপন করে গ্রাহকের অর্থ ও শেয়ার সরিয়ে নেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়।
আরেকটি কৌশল ছিল সিডিবিএলের ব্যবস্থায় গ্রাহকের মোবাইল নম্বর পরিবর্তন করে নিজেদের নম্বর যুক্ত করা। এতে শেয়ার কেনাবেচার এসএমএস বা অন্যান্য নোটিফিকেশন প্রকৃত বিনিয়োগকারীর কাছে না গিয়ে সংশ্লিষ্ট অসাধু ব্যক্তিদের কাছে যেত। ফলে বিনিয়োগকারীর অজান্তে তার শেয়ার বিক্রি করে অর্থ সরিয়ে নেওয়া সম্ভব হয়েছে।
ডিএসইর প্রতিবেদনে সবচেয়ে বেশি ১৬১ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ রয়েছে মশিউর সিকিউরিটিজের বিরুদ্ধে। এর মধ্যে সিসিএতে ঘাটতি ৬৮ কোটি ৫৮ লাখ টাকা এবং গ্রাহকের শেয়ার বিক্রি করে আত্মসাতের পরিমাণ ৯২ কোটি ৩৫ লাখ টাকা বলে পৃথক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
অভিযুক্ত সাতটি ব্রোকারেজ হাউসের বিরুদ্ধে আইনি ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হলেও ক্ষতিগ্রস্ত বিনিয়োগকারীদের অর্থ উদ্ধার নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে মামলা চলমান থাকায় দ্রুত অর্থ ফেরতের সম্ভাবনা ক্ষীণ এবং ইনভেস্টর প্রটেকশন ফান্ডও পর্যাপ্ত নয়। প্রযুক্তির দুর্বলতা ও অর্থ আত্মসাতের এই ঘটনায় সাধারণ বিনিয়োগকারীদের আস্থায় ধস নেমেছে
এছাড়া, তামহা সিকিউরিটিজে ১৩৯ কোটি ৭০ লাখ টাকা, সালতা ক্যাপিটালে ১০০ কোটি ৫২ লাখ টাকা, ক্রেস্ট সিকিউরিটিজে প্রায় ৮০ কোটি টাকা (নিরীক্ষায় যা ১০৫ কোটি টাকা), বাংকো সিকিউরিটিজে ৬৬ কোটি ৫৯ লাখ টাকা এবং শাহ মোহাম্মদ সগীর সিকিউরিটিজে ১৩ কোটি ১৬ লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগ রয়েছে। ব্লু চিপ সিকিউরিটিজের (সাবেক খুরশিদ সিকিউরিটিজ) বিরুদ্ধেও গ্রাহকের সোয়া দুই কোটি টাকার শেয়ার বিক্রি ও অর্থ আত্মসাৎ করার প্রমাণ মিলেছে।

অনিয়ম ঠেকাতে সফটওয়্যারে জোর
বিনিয়োগকারীদের অর্থ ও শেয়ার সুরক্ষায় বিএসইসি ২০২৫ সালের ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে সব ব্রোকারেজ হাউসে অপরিবর্তনযোগ্য ব্যাক-অফিস সফটওয়্যার চালুর নির্দেশ দিয়েছিল। তবে ডিএসইর অগ্রগতি প্রতিবেদনে দেখা যায়, ২৮০টি ব্রোকারেজ হাউস নতুন সফটওয়্যার গ্রহণ করলেও ১১৮টিতে বিনিয়োগকারীর তথ্য এবং ১০২টিতে লেজার ও পোর্টফোলিও স্থানান্তরের কাজ শেষ হয়নি। ২৪টি প্রতিষ্ঠান তখনও পুরোনো সফটওয়্যার ব্যবহার করছিল। আবার ১৩৫টি ব্রোকারেজ হাউস গ্রাহকদের লেনদেনের তথ্য ই-মেইল বা এসএমএসের মাধ্যমে পাঠায় না।
বাজারসংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রযুক্তিগত ব্যবস্থার এসব দুর্বলতা জালিয়াতির ঝুঁকি বাড়ায়। শুধু সফটওয়্যার পরিবর্তনের নির্দেশ দিলেই হবে না; তা বাস্তবে যথাযথভাবে কার্যকর হয়েছে কি না, সেটিও নিয়মিত পরীক্ষা করা দরকার।
এ বিষয়ে ডিএসইর ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) নুজহাত আনোয়ার বলেন, ‘অতীতে ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলো খতিয়ে দেখা হচ্ছে। ভবিষ্যতে এ ধরনের জালিয়াতি প্রতিরোধে ডিএসই একটি বিশেষ সফটওয়্যার তৈরি করছে, যা চালু হলে কনসোলিডেটেড কাস্টমার্স অ্যাকাউন্ট (সিসিএ) রিয়েল টাইমে পর্যবেক্ষণ এবং প্রতিদিন স্বয়ংক্রিয়ভাবে হিসাবের সমন্বয় (রিকনসিলিয়েশন) করা যাবে।’







