
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) মানুষের কর্মসংস্থানের জন্য হুমকি নয় বরং সঠিক নীতিমালা ও কার্যকর ব্যবহারের মাধ্যমে মানুষের কাজের পরিধি ও দক্ষতা বাড়িয়ে নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করতে পারে বলে মন্তব্য করেছেন বিশ্বব্যাংক গ্রুপের প্রেসিডেন্ট অজয় বঙ্গা।
সোমবার (১২ অক্টোবর) থাইল্যান্ডের ব্যাংককে বিশ্বব্যাংক ও আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) বার্ষিক সভায় তিনি এমন মন্তব্য করেন। কুইন সিরিকিট ন্যাশনাল কনভেনশন সেন্টারে আয়োজিত এ আন্তর্জাতিক সম্মেলনে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ, যুবসমাজ, কর্মসংস্থান এবং প্রযুক্তিগত রূপান্তর নিয়ে আলোচনা হয়।
বিশ্বব্যাংক প্রেসিডেন্ট বলেন, বর্তমান বিশ্ব অভাবনীয় পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন এবং অর্থনৈতিক সম্ভাবনা কাজে লাগাতে হলে কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে হবে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মতো আধুনিক প্রযুক্তি মানুষের কাজের ধরন বদলে দিচ্ছে। তবে প্রযুক্তির এই পরিবর্তনকে শুধু চাকরি হারানোর আশঙ্কা হিসেবে দেখলে চলবে না। বরং কীভাবে এআই মানুষের কাজের দক্ষতা বাড়াতে পারে, উৎপাদনশীলতা উন্নত করতে পারে এবং নতুন অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের পথ খুলে দিতে পারে, সেদিকে নজর দিতে হবে।
তিনি বলেন, সঠিক নীতিমালা, প্রয়োজনীয় বিনিয়োগ ও কার্যকর ব্যবহারের মাধ্যমে এআই উন্নয়নশীল দেশগুলোর অর্থনৈতিক অগ্রগতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। অন্যদিকে এসব ক্ষেত্রে পর্যাপ্ত প্রস্তুতি ও বিনিয়োগ না থাকলে প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের সুফল থেকে পিছিয়ে পড়তে পারে উন্নয়নশীল দেশগুলো। এতে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক বৈষম্য আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে
এসময় এআইকে শুধু বড় বড় করপোরেট প্রতিষ্ঠান ও প্রযুক্তি কোম্পানির মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে সাধারণ মানুষের উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর কাজে ব্যবহার করার বিষয়টি গুরুত্ব দেন অজয় বঙ্গা।
বার্ষিক সভার অংশ হিসেবে আয়োজিত ‘স্মল এআই : মোর অ্যান্ড বেটার জবস’ শীর্ষক অনুষ্ঠানের অনলাইন প্রশ্নোত্তর পর্বে বিশ্বব্যাংকের বিশেষজ্ঞ ভ্যালেন্টিনা ক্যালদেরন-মেজিয়া বলেন, নিম্ন ও নিম্ন-মধ্যম আয়ের দেশগুলোতে কর্মসংস্থানের বড় অংশের সঙ্গে যুক্ত ক্ষুদ্র প্রতিষ্ঠান ও স্বনিয়োজিত মানুষের ব্যবসা বাড়াতে ছোট এআই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। সাধারণ ফোন ব্যবহার করেও ব্যবসার মজুত ব্যবস্থাপনা, গ্রাহকদের সেবা দেওয়া এবং বিপণনের কাজে এ প্রযুক্তি ব্যবহার করা সম্ভব।
সম্মেলনে উন্নয়নশীল দেশগুলোর বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে সিলিকন ভ্যালির বাইরে সাশ্রয়ী ও স্থানীয় চাহিদাভিত্তিক ‘ক্ষুদ্র এআই’ প্রযুক্তির প্রসারের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
একইভাবে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা ব্যবসা পরিচালনা, হিসাব সংরক্ষণ এবং বাজারসংক্রান্ত তথ্য বিশ্লেষণে প্রযুক্তির সহায়তা নিতে পারেন। এর ফলে গ্রামীণ ও প্রান্তিক পর্যায়ে উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর পাশাপাশি নতুন আয়ের উৎস ও কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে।
দক্ষতা উন্নয়ন ও আজীবন শিখনের গুরুত্ব
ভবিষ্যতের শ্রমবাজারের চাহিদা পূরণে গতানুগতিক শিক্ষাব্যবস্থার বাইরে গিয়ে প্রায়োগিক শিক্ষা ও প্রযুক্তিগত দক্ষতা বৃদ্ধির ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। দ্রুত পরিবর্তনশীল কর্মজগতে শুধু প্রথাগত শিক্ষাগত যোগ্যতা অর্জনই যথেষ্ট নয়; নতুন প্রযুক্তির সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার সক্ষমতাও প্রয়োজন। এক্ষেত্রে আজীবন শিখন বা লাইফলং লার্নিংয়ের সংস্কৃতি গড়ে তোলার ওপর গুরুত্বারোপ করেন বিশ্বব্যাংক প্রেসিডেন্ট। তরুণদের পাশাপাশি নারী ও পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীকে আধুনিক প্রযুক্তি ও ডিজিটাল দক্ষতায় প্রশিক্ষিত করা গেলে কর্মসংস্থানের সুযোগ সম্প্রসারণ এবং বৈষম্য কমানোর ক্ষেত্রে অগ্রগতি সম্ভব।
সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বে নতুন সম্ভাবনা
সম্মেলনে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সুফল সর্বস্তরের মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে সরকারি ও বেসরকারি খাতের কার্যকর অংশীদারত্বের প্রয়োজনীয়তার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। প্রযুক্তিখাতে বিনিয়োগ বৃদ্ধি, উদ্ভাবনকে উৎসাহিত করা এবং কর্মসংস্থানমুখী পরিবেশ গড়ে তোলার ক্ষেত্রে সরকারের নীতিগত সহায়তার পাশাপাশি বেসরকারি খাতের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের উদ্ভাবনী সক্ষমতা এবং সরকারি খাতের নীতিগত সহায়তার সমন্বয়ে একটি শক্তিশালী ডিজিটাল অর্থনীতি গড়ে তোলা সম্ভব।
বিশেষ করে উন্নয়নশীল দেশগুলোতে এআই প্রযুক্তির সহজলভ্যতা নিশ্চিত করা গেলে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা, কৃষক ও তরুণদের জন্য নতুন অর্থনৈতিক সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে প্রযুক্তির সুফল সবার কাছে পৌঁছে দিতে প্রয়োজনীয় অবকাঠামো, দক্ষতা উন্নয়ন এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক নীতিমালা নিশ্চিত করতে হবে।
উন্নয়নশীল দেশের অর্থনীতিতে এআইয়ের সম্ভাবনা
সম্মেলনে বক্তরা বলেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার শুধু প্রযুক্তি খাতেই সীমাবদ্ধ নয়; কৃষি, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা ও ক্ষুদ্র ব্যবসাসহ অর্থনীতির বিভিন্ন ক্ষেত্রের প্রয়োগের সুযোগ রয়েছে। স্থানীয় ভাষাভিত্তিক ও সাশ্রয়ী প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানো গেলে উন্নয়নশীল দেশগুলোও এআইয়ের সুফল কাজে লাগাতে পারবে।
এক্ষেত্রে কর্মসংস্থান সৃষ্টি, উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি এবং মানুষের দক্ষতা উন্নয়নের মধ্যে সমন্বয় গুরুত্বপূর্ণ। প্রযুক্তির কারণে কাজের ধরন পরিবর্তিত হলে কর্মীদের নতুন দক্ষতা অর্জনের সুযোগ তৈরি করতে হবে, যাতে তারা পরিবর্তিত শ্রমবাজারে নিজেদের মানিয়ে নিতে পারেন। সঠিক পরিকল্পনা, কার্যকর নীতিমালা ও সরকারি-বেসরকারি সহযোগিতার মাধ্যমে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনৈতিক উন্নয়নের হাতিয়ার হিসেবে কাজে লাগানো সম্ভব। বিশ্বব্যাংকের আলোচনায় উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য এ প্রযুক্তির সম্ভাবনা কাজে লাগানো এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির বিষয়টি তাই বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে। চলমান বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দা, মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধ, জ্বালানী সংকট ও উচ্চ মূল্যস্ফীতির তীব্র চাপের মুখে বাংলাদেশের সামষ্টিক অর্থনীতি।
অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতায় কুইন সিরিকিট ন্যাশনাল কনভেনশন সেন্টারে ১২ থেকে ১৮ অক্টোবর পর্যন্ত অনুষ্ঠেয় এ আয়োজন বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে আইএমএফের কাছ থেকে নতুন ঋণ সহায়তা পাওয়ার ক্ষেত্রে এই সম্মেলনকে সরকারের জন্য একটি নির্ধারক ধাপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
আরএম/আইজে







