
একে একে মুখ খুলছেন চাক্ষুষ সাক্ষীরা। মামলার সাক্ষ্যগ্রহণও শেষের দিকে। ঠিক তখনই বদলে গেল মেজর জেনারেল (অব.) জিয়াউল আহসানের ট্রাইব্যুনালে আসার দৃশ্য। এতদিন স্বাভাবিকভাবে আনা হলেও এখন হাতে উঠেছে হাতকড়া, মাথায় হেলমেট আর শরীরেও পরানো হচ্ছে বুলেটপ্রুফ জ্যাকেট। তবে এর পেছনে শুধু নিরাপত্তাজনিত কারণ নয়, রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ গোয়েন্দা তথ্য। সাক্ষীদের বয়ানে সাবেক এই সেনা কর্মকর্তার বিরুদ্ধে একের পর এক গুরুতর অভিযোগ সামনে আসার পাশাপাশি নতুন করে নিরাপত্তা-উদ্বেগ তৈরি হয়েছে বলে দাবি করেছে একটি সূত্র।
তথ্য বলছে, মানবতাবিরোধী অপরাধের একাধিক মামলায় আসামি হিসেবে রয়েছেন জিয়াউল আহসান। এর মধ্যে আওয়ামী লীগ সরকারের শাসনামলে শতাধিক গুম-খুনের ঘটনায় করা মামলাটি সাক্ষ্যগ্রহণ পর্যায়ে। এ মামলায় সাবেক সেনাপ্রধান জেনারেল (অব.) ইকবাল করিম ভূঁইয়া থেকে শুরু করে জিয়াউলের দেহরক্ষী ইমরুল কায়েসও সাক্ষ্য দিয়েছেন। প্রসিকিউশনের অভিযোগ অনুযায়ী হত্যাকাণ্ডের শিকার আলকাছ মল্লিকের ভাই আব্বাস মল্লিকও ট্রাইব্যুনালের সামনে তুলে ধরেছেন ঘটনার বীভৎস বিবরণ। সবমিলিয়ে এখন পর্যন্ত সাক্ষ্য দিয়েছেন ১০ জন। তাদের জবানবন্দিতে যেন একে একে খুলছে গুম-খুনের অন্ধকার অধ্যায়ের পাতা। প্রতিটি সাক্ষ্যের সঙ্গে সামনে আসছে চাঞ্চল্যকর সব তথ্য।
গোয়েন্দা সূত্র জানায়, শতাধিক গুম-খুনের এ মামলায় এরই মধ্যে জবানবন্দি দিয়েছেন একাধিক গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষী। বিশেষত দেহরক্ষী, র্যাবের সিওসহ কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষীর জবানবন্দির পর জিয়াউলকে ঘিরে নতুন উদ্বেগ তৈরি হয়। স্যাবোটাজ বা নাশকতার উদ্দেশ্যে সম্ভাব্য কোনো পরিকল্পনা নিয়েও গোয়েন্দা সংস্থাগুলো তথ্য পেয়েছে বলে জানা গেছে।

দায়িত্বশীল একটি সূত্রের দাবি, নিরাপত্তার দায়িত্বে নিয়োজিত কোনো পুলিশ সদস্যের ভারী অস্ত্র ছিনিয়ে নিয়ে অন্তর্ঘাতমূলক কর্মকাণ্ড করার পরিকল্পনা করছিলেন জিয়াউল। ব্রাশফায়ার করে পালানোর পরিকল্পনাও ছিল তার। এছাড়া জিয়াউল আহসানের কাছে থাকা বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ তথ্যের কারণে অন্য পক্ষেরও তাকে টার্গেট করার আশঙ্কা রয়েছে। এমন গোয়েন্দা তথ্য পাওয়ার পর গত সপ্তাহে প্রসিকিউশন টিমের সঙ্গে বৈঠক করেন চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলাম। এরপর ট্রাইব্যুনালের অভ্যন্তরে নিরাপত্তা বাড়ানোর তাগিদ দেওয়া হয়।
জানা গেছে, অন্য বন্দিদের হাতকড়া পরিয়ে আনলেও কেরানীগঞ্জ বিশেষ কারাগার থেকে এতদিন স্বাভাবিকভাবেই জিয়াউলকে ট্রাইব্যুনালে আনা হতো। প্রিজনভ্যান থেকে নামিয়ে হাজতখানায় নেওয়ার সময় মামলাসংক্রান্ত নথিপত্র নিজের হাতেই বহন করতেন তিনি। পাশে থাকতেন দু-একজন পুলিশ সদস্য। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে গোয়েন্দা তথ্য পাওয়ার পর তার নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়। তাকে হাতকড়া, মাথায় হেলমেট ও বুলেটপ্রুফ ভেস্ট পরানোর পাশাপাশি অতিরিক্ত পুলিশ সদস্যও নিয়োজিত করা হয়। গত ১ সেপ্টেম্বর থেকে তাকে এভাবেই আনা শুরু হয়েছে।
শুধু ট্রাইব্যুনালের নিরাপত্তা নয়, গুমের মামলার গুরুত্বপূর্ণ ও প্রত্যক্ষদর্শী সাক্ষীদের নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে বলে জানিয়েছে একটি সূত্র। সূত্রটির দাবি, জিয়াউলের অপকর্ম নিয়ে ট্রাইব্যুনালের সামনে মুখ খোলার পর একাধিক সাক্ষীর বিষয়ে খোঁজখবর রাখছেন তার ঘনিষ্ঠজনরা। কোনো কোনো সাক্ষীর সন্তানরা স্কুল-কলেজে যাওয়া-আসা করছেন কি না, কোথায় যাচ্ছেন—এসব তথ্য সংগ্রহের চেষ্টা করা হচ্ছে বলেও দাবি সূত্রটির। গোয়েন্দা সংস্থার কাছ থেকে এমন তথ্য পাওয়ার পর সাক্ষীদের নিরাপত্তার বিষয়েও নজর দেওয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।







