লর্ডস টেস্টের একাদশে ছিলেন পাকিস্তানের বাম হাতি ওপেনার ইমাম-উল-হক। তবে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ম্যাচটিতে ব্যাট হাতে মাঠে নামতে পারেননি তিনি। বাম পায়ের পেশিতে চোটের কারণে পাকিস্তানের দুই ইনিংসেই ব্যাটিং থেকে দূরে ছিলেন এ ওপেনার।
ইমামের চোট নিয়ে শুরু থেকেই নানা প্রশ্ন উঠছিল। এমনকি কেউ কেউ তার চোটকে লোকদেখানো বলেও মন্তব্য করেন। এবার সেই সন্দেহ প্রকাশ করেছেন পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ডের (পিসিবি) হাই পারফরম্যান্স বিভাগের পরিচালক আকিব জাভেদ। একই সঙ্গে ইমামের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার ইঙ্গিতও দিয়েছেন পাকিস্তানের সাবেক এ পেসার।
পাকিস্তানের সংবাদমাধ্যম জিও-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে আকিব জানান, ইমামের ঘটনায় তিনি ‘গভীরভাবে হতাশ’। চোটের কারণে দুই ইনিংসেই ব্যাটিং না করার সিদ্ধান্তের বিষয়ে ইমামকে তদন্তের মুখোমুখি হতে হবে বলেও জানিয়েছেন তিনি।
আকিব বলেন, ‘ইমামের চোট নিয়ে বড় প্রশ্ন রয়েছে এবং আমি গভীরভাবে হতাশ। অতীতে খেলোয়াড়রা চোট পেয়েও প্লাস্টার করে মাঠে নামার চেষ্টা করেছে। আমরা এ ঘটনায় ব্যবস্থা নেব। পেশিতে টান লাগার কারণে কীভাবে দুই ইনিংসেই ব্যাট করা থেকে পুরোপুরি ছিটকে যাওয়া সম্ভব? তার চেষ্টা করা উচিত ছিল, লড়াই করা উচিত ছিল। তাকে তদন্তের মুখোমুখি হতে হবে।’
তবে ইমাম চোটের ভান করেছেন কিনা, সে বিষয়ে নিশ্চিত নন বলেও জানান আকিব। তার ভাষায়, ‘সে চোটের ভান করেছে কিনা, তা আমি নিশ্চিত নই। তবে এ ধরনের পেশির টান আপনাকে পুরোপুরি ব্যাট করা থেকে আটকে রাখতে পারে না।’
ইংল্যান্ডের বিপক্ষে লর্ডসে দ্বিতীয় টেস্টে বড় ব্যবধানে হারের পর পাকিস্তানের সাত ক্রিকেটারকে দেশে ফেরত পাঠানো হয়েছে। তাদের একজন ইমাম। ম্যাচের দ্বিতীয় দিনের খেলা শুরুর কয়েক মিনিট আগে তার চোটের বিষয়টি জানায় পিসিবি।
সেদিন বোর্ডের পক্ষ থেকে জানানো হয়, ইমামের বাম পায়ের পেশিতে চোট রয়েছে। টেস্টের বাকি সময়ে তিনি খেলতে পারবেন কি না, তা চিকিৎসকদের পরামর্শের ওপর নির্ভর করবে। শেষ পর্যন্ত পরের দুই দিন মাঠে নামেননি তিনি। তবে চতুর্থ দিনের সকালে দলের অন্য সদস্যদের সঙ্গে অনুশীলনে দেখা যায় ইমামকে।
এ সময় ধারাভাষ্য দিতে গিয়ে তার সমালোচনা করেন ইংল্যান্ডের সাবেক পেসার স্টুয়ার্ট ব্রড। ইমামের অনুশীলনকে ‘লোকদেখানো’ বলে মন্তব্য করেন তিনি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ইমামের সমালোচনা করেন অস্ট্রেলিয়ার সাবেক ওপেনার ডেভিড ওয়ার্নারও।
ইমামের পাশাপাশি আরও ছয় ক্রিকেটারকে দেশে ফেরত পাঠিয়েছে পাকিস্তান। একই সঙ্গে প্রধান কোচ সরফরাজ আহমেদ ও বোলিং কোচ উমর গুলকেও দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে।
পাকিস্তান দলে বড় ধরনের এই পরিবর্তনের কারণও ব্যাখ্যা করেছেন আকিব। তার দাবি, দুই টেস্টে পাকিস্তান কোনোভাবেই প্রতিদ্বন্দ্বিতা গড়ে তুলতে পারেনি।
তিনি বলেন, ‘দুটি টেস্ট হয়ে গেছে, কিন্তু কোনোভাবেই দল প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারেনি। এখনো একটি টেস্ট বাকি। তাদের কাছে পেস বোলিং অলরাউন্ডার, দ্বিতীয় উইকেটকিপার এবং উবায়েদ শাহর মতো একজন ফাস্ট বোলারও ছিল। কিন্তু তাদের খেলানো হয়নি।’
দল নির্বাচনের প্রসঙ্গে আকিব জানান, তিনি অধিনায়ক বাবর আজম ও কোচের সঙ্গে উবায়েদ শাহকে খেলানোর বিষয়ে কথা বলেছিলেন। তাঁর মতে, দলের পেস আক্রমণে নতুন গতি আনতে উবায়েদকে সুযোগ দেওয়া প্রয়োজন ছিল।
দল গঠন নিয়েও নিজের অসন্তোষের কথা জানিয়েছেন আকিব। তিনি বলেন, ‘আমাদের প্রথম সাত ব্যাটসম্যানের কেউ বোলিং করে না। একজন অলরাউন্ডার রাখা উচিত ছিল। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো উবায়েদ শাহকে খেলানো, যে ঘণ্টায় প্রায় ১৪০ কিলোমিটার গতিতে বল করে। একজন দ্রুতগতির বোলারই পুরো বোলিং আক্রমণের গঠন বদলে দিতে পারে।’
সালমান আগার সাম্প্রতিক ফর্ম নিয়েও মন্তব্য করেন আকিব। তিনি বলেন, সালমান ফর্মে না থাকায় তাঁকে বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্ত বুঝতে পেরেছেন। তবে উইকেটকিপার হিসেবে মোহাম্মদ রিজওয়ানের পরিবর্তে গাজি ঘোরিকে খেলানো উচিত ছিল বলেও মত দেন তিনি।
পাকিস্তানের সাম্প্রতিক পারফরম্যান্স নিয়ে আকিবের হতাশা স্পষ্ট তার বক্তব্যে। তিনি বলেন, ‘কাউকে না কাউকে ব্যবস্থা নিতেই হতো। আমরা প্রতিদ্বন্দ্বিতা পর্যন্ত করতে পারছি না বলে পুরো বিশ্ব আমাদের নিয়ে হাসছে। দেশে ফিরিয়ে নেওয়া খেলোয়াড়দের আমরা যে বার্তা দিচ্ছি, তা হলো গুরুত্বপূর্ণ সফরে নিজেদের খেলাটা আরও উঁচুতে নিতে হবে এবং প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে হবে। আমরা যেন অন্তত কিছু চেষ্টা দেখতে পাই।’
তবে পাকিস্তান ক্রিকেটে চলমান অস্থিরতার জন্য শুধু খেলোয়াড় নির্বাচনকে দায়ী করা যায় কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। কারণ, প্রায় দুই বছর ধরে হাই পারফরম্যান্স বিভাগের দায়িত্বে থাকা আকিবের সময়ে পাকিস্তানের একাধিক কোচ দায়িত্বে এসেছেন এবং বিদায় নিয়েছেন। তাদের মধ্যে ছিলেন জেসন গিলেস্পি ও গ্যারি কারস্টেনের মতো কোচ।
নির্বাচক ও হাই পারফরম্যান্স বিভাগের দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি কিছু সময় কোচের ভূমিকাতেও ছিলেন আকিব। মাত্র তিন মাস আগে সরফরাজ আহমেদকে প্রধান কোচ করার পেছনেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল তার। তবে ছয়টি টেস্টের পরই সরফরাজকে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া দল পুনর্গঠনের পর পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ডের বিভিন্ন দায়িত্বে থাকা মিসবাহ-উল-হকও নির্বাচক প্যানেল থেকে পদত্যাগ করেছেন।
তবে মিসবাহর মতো সরে যাওয়ার কোনো পরিকল্পনা নেই বলে জানিয়েছেন আকিব। তার যুক্তি, দল গঠনের সময় সিদ্ধান্ত নেওয়ার দায়িত্ব কোচ ও অধিনায়কের। কিন্তু সফরে যাওয়ার পর ম্যাচভিত্তিক একাদশ নির্ধারণে তাদের সরাসরি কিছু করার থাকে না।
আকিব বলেন, ‘কোচ বা অধিনায়ক হিসেবে আমরা যখন দল নির্বাচন করি এবং একটি দল গঠন করি, তখন সেই দলের দায়িত্ব আমাদের। কিন্তু তারা সফরে যাওয়ার পর ম্যাচ অনুযায়ী দল গঠনের বিষয়ে আমরা আর কিছু করতে পারি না। দল নির্বাচনের সময় এসব খেলোয়াড়ের পারফরম্যান্স নিয়ে কেউ প্রশ্ন তোলেনি। কিন্তু খেলোয়াড়রা যখন পুরোপুরি ফর্মের বাইরে চলে যায় এবং দল কোনোভাবেই প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারে না, তখন আমাদের সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘সঠিক সমন্বয় নিয়ে খেলার বার্তা পাওয়ার পরও যখন সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় না, তখন সেটি সমস্যা। অধিনায়ক, প্রধান কোচ ও দলের ব্যবস্থাপনার কিছু দায়িত্ব রয়েছে।’
এদিকে নতুন টেস্ট কোচ মাইক হেসনের ওপর আস্থা রাখছেন আকিব। সাদা বলের ক্রিকেটের পাশাপাশি টেস্ট দলের দায়িত্ব পাওয়া হেসনকে পূর্ণ সমর্থন দেওয়ার কথা জানিয়েছেন তিনি।
আকিব বলেন, ‘একজন মানুষ একটি দল চালায় না। কোচ ও অধিনায়ক একসঙ্গে দল পরিচালনা করেন। মাইক হেসন দায়িত্ব নিয়েছেন। আমরা তাকে সবদিক থেকে সমর্থন দেওয়ার চেষ্টা করব। বাবর ও মাইক কীভাবে একসঙ্গে কাজ করে, সেটি দেখা যাক।’
তিনি আরও বলেন, ‘একটি ম্যাচেই আমরা ফল পাব, এমনটা দেখা কঠিন। তবে মানুষের দেখা উচিত, পাকিস্তান ক্রিকেটে এখনো প্রতিভা রয়েছে।’
ইংল্যান্ডের বিপক্ষে সিরিজের তৃতীয় ও শেষ টেস্ট শুরু হবে ৯ সেপ্টেম্বর। বার্মিংহামের এজবাস্টনে অনুষ্ঠিত হবে ম্যাচটি।







