বাংলাদেশে কীটনাশকের ব্যবহার সাত দশক ধরে চলছে। ২০২৩ সালে দেশে কীটনাশকের ব্যবহার ছিল ৩৯ হাজার টন। এ সময় আটটি বহুজাতিক কোম্পানি দুই হাজার সাতশ পঞ্চাশ কোটি টাকার কীটনাশক আমদানি করেছে। অথচ ১৯৭২ সালে, কীটনাশকের ব্যবহার ছিল চার হাজার টন। ২০০৮ সালে কীটনাশকের ব্যবহার হয় ৪৯ হাজার টন। ২০১৭ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত কীটনাশকের ব্যবহার হয় ৩৭-৩৮ হাজার টন। বালাইনাশক মানে এমন এক দ্রব্য বা দ্রব্যের মিশ্রণ যা কোনো পোকা, ছত্রাক, ব্যাকটেরিয়া, কৃমি (নেমাটোড), ভাইরাস, আগাছা, ইঁদুর জাতীয় প্রাণী বা অন্যান্য উদ্ভিদ বা কীটপতঙ্গের বিরুদ্ধে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভবে প্রতিরোধ, ধ্বংস, প্রশমন, বিতাড়ন বা নিয়ন্ত্রণের জন্য ব্যবহৃত হয়। বাংলাদেশে বালাইনাশক (পেস্টিসাইডস) আইন ২০১৮ নামের একটি আইন আছে। এই আইনের ২ ধারায়, বালাইনাশকের সংজ্ঞা দেওয়া আছে। এতে ৮ ধারায় বলা আছে ‘বালাইনাশকটি আগাছা ব্যতীত অন্যান্য উদ্ভিদ, মানুষ বা প্রাণীর স্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হলে এর নিবন্ধন বাতিল হবে।’
কীটনাশক কীটপতঙ্গ মারার জন্য এক ধরনের বিষাক্ত রাসায়নিক পদার্থ। এটি তিনভাবে পাওয়া যায়। গুঁড়া, তরল ও অ্যারোসোল। আমাদের দেশে পাঁচ ধরনের কীটনাশক ব্যবহার করা হয়। এগুলো হলো কীটনাশক, ছত্রাকনাশক, আগাছানাশক, পতঙ্গনাশক ও ইঁদুরনাশক।
বাংলাদেশে ৩৭৭টি কীটনাশক বাজারজাতকরণের জন্য নিবন্ধনকৃত। এসব কীটনাশকের সব, কম-বেশি বিপজ্জনক। এর মধ্যে বেশি বিপজ্জনক রিনকর্ড, সিমবুন, সুমিসাইডিন, হেপ্টাকোর, থায়াডিন, ডিডিটি ইত্যাদি। কীটনাশক স্প্রে করে দেওয়া হলে, তার ৯৮ ভাগেরও বেশি লক্ষ্যবস্তুর বাইরে ছড়িয়ে পড়ে।
যার নেতিবাচক প্রভাব শুধু প্রয়োগের ক্ষেত্রেই নয় দূরবর্তী জলজ পরিবেশ, চারণ এলাকা ও মানব বসতিতেও বাহিত হয়। একটি তথ্য অনুযায়ী, পৃথিবীর ৬০ ভাগেরও বেশি কৃষিজমি কীটনাশক দূষণের ঝুঁকিতে এবং ৩০ ভাগেরও বেশি জমি উচ্চ ঝুঁকিতে। আমাদের দেশে ৩৭৭টি কীটনাশক বাজারজাতকরণের জন্য নিবন্ধনকৃত। একটি তথ্য অনুযায়ী পৃথিবীর ৬০ ভাগেরও বেশি কৃষিজমি কীটনাশক দূষণের ঝুঁকিতে এবং ৩০ ভাগেরও বেশি জমি উচ্চ ঝুঁকিতে। এসব কীটনাশক ব্যবহারের নীতিমালা থাকলেও, অধিকাংশ কৃষক তা জানে না এবং মানে না। যেমন নীতিমালায় বলা আছে কীটনাশক ব্যবহারের সময় মুখে মাস্ক পরতে হবে। বাতাসের উল্টা দিকে প্রয়োগ করা যাবে না। শরীরের কোনো অংশে যেন কীটনাশক না পড়ে, সে জন্য প্রতিরোধক ব্যবস্থা রাখতে হবে প্রভৃতি।
সম্প্রতি রাজশাহীতে জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশের ওপর কীটনাশকের ক্ষতিকর প্রভাব নিয়ে, মাঠ পর্যায়ে অনুসন্ধানমূলক সমীক্ষা করেছে ‘বারসিক’ নামের একটি গবেষণা প্রতিষ্ঠান। তারা রাজশাহীর আটটি উপজেলার ১৯টি কৃষিপ্রধান অঞ্চলে এই সমীক্ষা চালান। এতে তারা দেখতে পান, সেখানকার ৬৮ ভাগ মানুষ নিষিদ্ধ কীটনাশক ব্যবহার করে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। নিষিদ্ধ কীটনাশক সেখানকার ৯৯ ভাগ কীটনাশকের দোকানেই পাওয়া গেছে। ৯৩.৩৭ ভাগ মানুষ জানে না, এসব কীটনাশক নিষিদ্ধ। তাদের ভাষ্যমতে, নিষিদ্ধ কীটনাশকগুলো এমনভাবে বিক্রি হচ্ছে যে, দেখে বোঝার উপায় নেই যে, এসব নিষিদ্ধ। গবেষণায় দেখা গেছে, এসব কীটনাশক ব্যবহারের কারণে গবাদিপশু ও পাখি যেমন হাস, মুরগি, কবুতর, গরু, ছাগলসহ অসংখ্য প্রাণী মারা পড়ছে। সমীক্ষায় যেসব নিষিদ্ধ কীটনাশক পাওয়া গেছে, সেগুলো হলো জিরো হার্ব ২০ এসএল (প্যারাকোয়াট), ফুরাডান ৫জি ( কার্বোরাইল), এরোক্সান ২০ এসএল (প্যারাকোয়াট), গ্যাস ট্যাবলেট (অ্যালুমিনিয়াম ফসফাইড), কার্বোফোরান ৩ জিএসিআই (কার্বোফোরান), ইঁদুর মারার বিষ (বডি ফ্যাকুয়াম) ও তালাফ ২০ এসএল (প্যারাকোয়াট)। সম্প্রতি বাংলাদেশ
কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের কীটতত্ত্ব বিভাগের একজন অধ্যাপকের নেতৃত্বে দেশে প্রথমবারের মতো, বেশি বিপজ্জনক বালাইনাশক চিহ্নিত করেছেন একদল গবেষক। তারা জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও) এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) আটটি মানদণ্ড অনুযায়ী, ২৫টি বিপজ্জনক বালাইনাশক শনাক্ত করেছেন। এই ২৫টি বালাইনাশকের ১১টি কীটনাশক, ৭টি ছত্রাকনাশক, ৫টি আগাছানাশক, ২টি ইঁদুর নাশক। এই ২৫টি বালাইনাশকের মধ্যে ৯টি বিপজ্জনক কীটনাশক বেশি ব্যবহৃত হয়। এগুলো হলো এবামেকটিন, ক্লোরপাইরিফস, প্যারাকুয়াট, গ্লাইফসেট, গ্লুফোসিনেট অ্যামোনিয়াম, কার্বেন্ডাজিম, প্রোপিকোনাজোল, জিঙ্ক ফসফাইড ও ব্রোমাডিওলন। মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের তথ্যমতে, আমাদের দেশে ব্যবহৃত রাসায়নিক কীটনাশকের ৬০% চরম বিষাক্ত, ৩০% কম বিষাক্ত ও ১০% বিষাক্ত নয়। অর্গানোক্লোরিন, পাইরিথ্রয়েড, অর্গানোফসফেট ও কার্বনেট গ্রুপের কীটনাশক মাছের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। নিওনিকোটিনয়েডস, ফিপ্রোনিল, ডিডিটি পরিবেশের জন্য এতটাই ক্ষতিকারক যে, এসব এখন আমাদের দেশে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। রাসায়নিক কীটনাশক শুধু পরিবেশ ও মানুষের অনেক ক্ষতি করে না, এর ব্যবহারে উৎপাদন বাড়লেও মাটি, পানি, বাতাস দূষিত হয়। পোকামাকড় মেরে ফেলার কারণে হ্রাস পায় জীববৈচিত্র্য।
সবচেয়ে মারাত্মক প্রভাব পড়ে মানুষের স্বাস্থ্যের ওপর। এর ফলে ক্যানসারসহ নানাবিধ রোগ দেখা যায়। ডিডিটি, অর্গানোফসফেট ব্যবহারে ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়ে। এটি ফুসফুসে গিয়ে মারাত্মক প্রদাহ সৃষ্টি করে, যা শ^সনতন্ত্রের ক্ষতি করে। শ্বাসকষ্টের এসব সমস্যা বেশি দেখা যাচ্ছে, গ্রামের কৃষকদের। সাধারণত লিভার, ফুসফুস ও পাকস্থলীতে ক্যানসার হচ্ছে। তারা শ্বাসকষ্ট, অ্যাজমার মতো সমস্যায় আক্রান্ত হচ্ছেন। কীটনাশক ব্যবহার থেকে পুরুষদের বীর্য উৎপাদন হ্রাস ও শুক্রাণু কমে যেতে পারে ও নারীদের মাসিক সমস্যা, গর্ভধারণ ও গর্ভপাতের সমস্যা হতে পারে। ভূমিষ্ঠ শিশুর জন্মগত সমস্যা দেখা দিতে পারে। শিশুর বুদ্ধিমত্তা হ্রাস হতে পারে। এমনকি শিশুর আচরণগত নানা সমস্যাও দেখা দিতে পারে। এ ছাড়া পারকিনসন রোগ, স্মৃতিশক্তি হ্রাস, স্নায়বিক দুর্বলতা প্রভৃতিও হতে পারে।
গবেষকদের মতে, অনেক বালাইনাশক এতটাই বিপজ্জনক যে, এসব বালাইনাশকের রেজিস্ট্রেশন বাতিল করা উচিত। তাদের মতে, মাঠ পর্যায়ে বিদ্যমান বালাইনাশকের যে আইন আছে, তা বাস্তবায়িত হলেও, দেশের কৃষক ও কৃষি খাত রক্ষা করা সম্ভব। কিন্তু পরিতাপের বিষয় যে, এসব আইনের বাস্তবে কোনো প্রয়োগ নেই।
তাই এ মুহূর্তে বালাইনাশক ডিলারদের লাইসেন্স প্রদান কঠোর করা উচিত এবং বিপজ্জনক বালাইনাশক চিহ্নিত করে, এসবের নিবন্ধন বাতিল করা দরকার। তা না হলে, এর ক্ষতিকর প্রভাব দীর্ঘস্থায়ী হবে। কীটনাশকের দাম বেড়ে যাওয়ায় কৃষকরা লোকসানের মুখে পড়ছেন। তথ্যমতে, দেশে ৫০০-এরও বেশি নকল কোম্পানি আছে, যারা ভেজাল কীটনাশক বিক্রি করে। এ ছাড়া ভেজাল কীটনাশক আমদানিও করা হচ্ছে। এক সময় কীটনাশক আমদানিকারকের সংখ্যা ছিল ২০০। এটি এখন বেড়ে প্রায় ৭০০ হয়েছে। দেশে বালাইনাশক কোম্পানির সংখ্যাও খুব বেশি একটা বাড়েনি। বৈধ কীটনাশকের দাম বেড়েছে, ২০ ভাগেরও বেশি। অথচ কীটনাশক নিবন্ধনের শর্ত রয়েছে ১৬টি। এর মধ্যে একটি শর্ত হলো সরকার অনুমোদিত কোম্পানি ছাড়া ডিলাররা বিক্রি করতে পারবেন না কোনো ওষুধ। অথচ বাস্তবে ঠিক এর উল্টো চিত্র। কে শুনে কার কথা? ডিলাররা অধিক কমিশনের লোভে এসব নকল ওষুধ বিক্রি করে যাচ্ছে। সেই ওষুধ ব্যবহার করে কৃষকরা নিঃস্ব হচ্ছেন। একসময় কৃষি ও কৃষক, উভয়ই মারাত্মক ক্ষতির মুখে পড়বে। ফসলে ক্ষতিকর জীবাণু বাড়ার কারণে, কীটনাশকের ব্যবহার বেড়েছে। একই সঙ্গে বেড়েছে কীটনাশকের দাম।
ভেজাল কীটনাশকে সয়লাব বাজার। মৃত্তিকা সম্পদ উন্নয়ন ইনস্টিটিউটের ল্যাবে ভেজাল সারের প্রমাণ পাওয়া গেছে। এ ছাড়া যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেজাল বালাইনাশকের প্রমাণ মিলেছে। ফলে প্রতারিত হচ্ছেন কৃষকরা। এসব কীটনাশক ব্যবহারে গাছ মরে যাচ্ছে। একদিকে চড়া দাম দিয়ে কৃষক কিনছেন কীটনাশক, অন্যদিকে সেই নকল কীটনাশকের ব্যবহারে মারা যাচ্ছে গাছ। অধিকাংশ ক্ষেত্রে উৎপাদনের অর্ধেক টাকা খরচ হয়ে যায় কীটনাশকের পেছনে। ফলে সর্বস্বান্ত হচ্ছেন কৃষক। কিন্তু এমন অবস্থা কতদিন চলবে? কীটনাশকের ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ করতে না পারলে, কৃষককে বাঁচাতে না পারলে আমাদের কৃষি অর্থনীতির পরিণতি কী হবে, একবার কল্পনা করা যায়! এ বিষয়ে এখনই যদি আমরা সচেতন না হই, তাহলে বড় ধরনের খেসারত দিতে হতে পারে। দেশের কৃষক সমাজকে অবহেলা না করে, শক্তিশালী নীতি ও আইনের সঠিক প্রয়োগ করতে হবে।
লেখক: পরিবেশ বিষয়ক লেখক
mitra_bibhuti@yahoo.com








