কৃষিপ্রধান দেশের ধান-চাল উৎপাদনে অন্যতম জেলা দিনাজপুর। প্রকৃতিগতভাবে এই জেলায় চিকন ধান বা সুগন্ধি ধানের ফলন বেশি হয়ে থাকে। তবে এবার ধান থেকে নয়, সেখানে বাঁশের ফুল থেকে চাল তৈরি করে তাক লাগিয়ে দিয়েছেন ফুলবাড়ী উপজেলার তরুণ কৃষক সাঞ্জু রায়। তা খেতেও নাকি খুব সুস্বাদু!
জানা গেছে, ধান থেকে উৎপাদিত চালের মতো হুবহু এই বাঁশ ফুলের চাল। ভাত, পোলাও, খিচুড়ি, আটা কিংবা পায়েস সব কিছু তৈরি হচ্ছে বাঁশ ফুলের চাল থেকে। উৎপাদিত এই চাল ৪০ টাকা কেজি দরে কিনে নিয়ে যাচ্ছেন অনেকেই। ওই এলাকায় এ চালের চাহিদাও নাকি প্রচুর! এমনকি গ্রাহকদের চাল দিতে হিমশিম খাচ্ছেন সাঞ্জু রায়।
তবে প্রশ্ন হচ্ছে বাঁশের ফুল থেকে এই চাল উৎপাদন এবং মানুষের খাদ্য হিসেবে এটির বৈজ্ঞানিক কোনো স্বীকৃতি এখনো মিলেনি। এমনকি এ বিষয়ে সুনির্দিষ্ট কোনো গবেষণার তথ্যও পাওয়া যায়নি। তাহলে এই বাঁশ ফুল থেকে উৎপাদিত চাল কি আসলেই খাওয়ার উপযোগী? নাকি এটি মানবদেহের জন্য ক্ষতিকর? এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের সাথে কথা বলে বেশ কিছু তথ্য পাওয়া গেছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দেশে বর্তমানে প্রায় ৪০ প্রজাতির বাঁশ রয়েছে। এর মধ্যে গ্রাম্য ভাষায় বেইড়া বাঁশ (বেড়ুয়া বাঁশ) বলে পরিচিত এই বাঁশের ফুল থেকে উৎপাদন করা হচ্ছে চাল। অন্যান্য চালের মতোই বাঁশের ফুল সংগ্রহকৃত বীজ ধানের মিলে ভাঙিয়ে তা থেকে চাল তৈরি করা হচ্ছে।
উদ্ভিদ বিজ্ঞানীরা বলছেন, বাংলাদেশের গ্রামাঞ্চলে সাত ধরনের বাঁশ বেশি দেখা যায়। এর মধ্যে বরাক, করজবা, বাইজ্জা, তলস্না, মাকলা, ভুদুম অন্যতম। তবে করজবা ও বাইজা বাঁশের ফুল হয়, এসব প্রজাতির বাঁশের কান্ড পুরু ও কাষ্ঠল বলে ঘরের বেড়া ও খুঁটি হিসেবে ব্যবহৃত হয়। এ ছাড়া পাকা বাড়ি তৈরির সময় ছাদ ঢালাই দিতেও এসব বাঁশের প্রয়োজন হয়।
প্রচলিতভাবে ধান থেকে চাল উৎপাদন হয়, কিন্তু বাঁশের ফুল থেকে চাল উৎপাদনের ঘটনাটি একেবারে বিরল। এর পূর্বে বাংলাদেশের আর কোথাও এরকম চাল উৎপাদন হওয়ার কোনো তথ্য নেই। এমন কি চাল গবেষণা ইনস্টিটিউট বা কৃষি অধিদপ্তরেও এর কোনো তথ্য পাওয়া যায় নি। এ কারণে এ চাল মানুষের দেহের জন্য উপযোগী কি না সে বিষয়েও কোনো মতামত দিতে পারেননি ফুলবাড়ী উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা রুম্মান আক্তার ও রংপুর ধান গবেষণাগার, রংপুর ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (ব্রি) আঞ্চলিক কার্যালয় প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. রকিবুল হাসান।
ফুলবাড়ী উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা রুম্মান আক্তার বলেন, ৫০ থেকে ১০০ বছর পরপর নির্দিষ্ট প্রজাতির বেশ কিছু বাঁশের ফুল আসে। আর সেই ফুলে বীজ তৈরি হয়। কিন্তু সেই বীজের চাল মানবদেহের জন্য উপযোগী কি না সেটি গবেষণার কাজ। গবেষণা ছাড়া এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করা সম্ভব নয়।
একই কথা বলেন রংপুর ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (ব্রি) আঞ্চলিক কার্যালয় প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. রকিবুল হাসান। তিনি বলেন, বাঁশের বীজ থেকে চাল উৎপাদন হয় এটা প্রথম জানলাম। এমন কথা এর আগে দেশের কোথাও শোনা যায় নি। বিষয়টি নিয়ে গবেষণার মাধ্যমে এর সঠিকতা নিরূপণ করা হবে।
এ বিষয়ে হাজী মোহাম্মদ দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (হাবিপ্রবি) উদ্যানতত্ত্ব বিভাগের শিক্ষক আহসানুল কবির বলেন, বাঁশ মূলত ‘গ্রামিনি’ পরিবারের একীভূত সদস্য। এই পরিবারের অন্যান্য সদস্য ধান, গম, ভুট্টা ও সরগম। সাধারণত ৫০ বছরের অধিক সময় পরে বাঁশের জীবনচক্র শেষান্তে ফুল ও ফল আসতে পারে। তবে সেই ফল খাওয়া যায় কি না, এমন কোনো গবেষণা তাঁর জানা নেই।
তবে বাঁশের ফুল থেকে তৈরি এই চাল খাওয়ার উপযোগী বলে জানিয়েছেন দিনাজপুর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক নুরুজ্জামান। তিনি বলেন, ধান ও বাঁশ একই পরিবারে এরা উদ্ভিদ। তারা একই ধরনের দানা উৎপাদিত করতে পারে। এ চাল খাওয়ার উপযোগী। এর পুষ্টিগুন সাধারণ চালের তুলুনায় কম না। তবে বাঁশের বীজ থেকে চাল উৎপাদন আসলেই একটি বিরল ঘটনা।
বাঁশের চাল থেকে তৈরি করে আলোচনায় আসা কৃষক সাঞ্জু রায়ের সঙ্গে কথা বলে পূর্বেও এই চাল উৎপাদন ও খাওয়ার তথ্য জানা গেছে। সাঞ্জু রায় জানান, বাঁশের ফুল থেকে চাল উৎপাদনের এই ধারণা তিনি কালী চন্দ্র রায় (৭০) নামে স্থানীয় এক বৃদ্ধের কাছ থেকে পান। মুক্তিযুদ্ধের সময় যখন চাল কিংবা ভাত অপ্রতুল ছিল তখন স্থানীয়রা এই বাঁশের ফুল থেকে চাল উৎপাদন করে রান্না করে খেতেন। সম্প্রতি ঐ বৃদ্ধ সাঞ্জু রায়ের এলাকায় বাঁশ ফুল দেখে চাল উৎপাদন করার কথা তাকে বলেন। পরে তিনি চাল উৎপাদন করার পরিকল্পনা করেন।
বাঁশের ফুল থেকে পাওয়া এই চালসদৃশ দানার পুষ্টিগুণ ও অন্যান্য বিষয় নিয়ে প্রথম আলো’র সঙ্গে কথা বলেছেন হাজী মোহাম্মদ দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (হাবিপ্রবি) ফুড প্রসেসিং অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের শিক্ষক মারুফ আহমেদ।
আমাদের দেশে সাধারণত সব ধরনের বাঁশে ফুল দেখা যায় না। বাঁশে এই ফুল আসার বিষয়টি নিয়ে তিনি বলেন, বাঁশ হচ্ছে একধরনের গুল্মজাতীয় বৃক্ষ। ফাঁপা কাণ্ডবিশিষ্ট ঘাসজাতীয় উদ্ভিদ। বন বিভাগের হিসাব অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে ৪০ প্রজাতির বাঁশ আছে। সচরাচর বাঁশের ফুল বা ফল হয় না। তবে বিশেষ প্রজাতির দুই ধরনের বাঁশে ৩০ থেকে ১০০ বছর পর ফুল আসে। মূলত ওই প্রজাতির বাঁশের জীবনচক্রের শেষ দিকে ফুলটা আসে। ফুল আসার পরই বাঁশগাছ মারা যায়। ফুল থেকে বীজ হয় এবং খোসা অপসারণ করে চাল পাওয়া যায়। সাধারণত এই চাল বাঁশের চাল নামেই পরিচিত।
বাঁশের ফুল থেকে তৈরি চালের পুষ্টিগুণ নিয়ে মারুফ আহমেদ বলেন, সাধারণ চালের চেয়ে বাঁশের চালে প্রোটিনের মাত্রা বেশি এবং ফ্যাট কম থাকে। এ ছাড়া অ্যামাইলোজ স্টার্চের পরিমাণ ভালো থাকায় এটা মানবদেহের জন্য উপকারী। এই ভাত কোলেস্টেরল কমানো, হাড়ের ব্যথা কমানো ও অ্যান্টিডায়াবেটিক হিসেবে কাজ করে বলে গবেষণায় জানা গেছে।
তিনি বলেন, ভারতের ত্রিপুরাসহ কিছু কিছু জায়গায় সচেতনভাবে এই প্রজাতির বাঁশের আবাদ করা হয়। ওই বীজ থেকে বাঁশগাছের চারা হওয়ার কথা। যদি সেটা করা সম্ভব হয়, তাহলে চাষাবাদ করা যেতে পারে। পাশাপাশি এ বিষয়ে বন বিভাগ কিংবা সংশ্লিষ্ট দপ্তরের আরও গবেষণা হওয়া দরকার বলে পরামর্শ দেন এ শিক্ষক।
বাংলাদেশ বন গবেষণা ইনস্টিটিউটের সিভিকালচার জেনেটিকস বিভাগের চট্টগ্রাম বিভাগীয় কর্মকর্তা মাহবুবুর রহমান বলেন, বাঁশে সাধারণত ফুল হয় না। তবে প্রজাতিভেদে ২৫ থেকে ৬০ বছর পরে ফুল আসতে পারে। ফুল আসা মানেই ওই বাঁশের জীবনচক্র শেষ হওয়া। বাঁশফলটা দেখতে অনেকটা ধানের বীজের মতো। এটি মূলত ইঁদুরের প্রিয় খাবার।
-Daily Sun






