আজ বিশ্ব ডিম দিবস। ইন্টারন্যাশনাল এগ কমিশনের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী প্রতি বছর অক্টোবরের দ্বিতীয় শুক্রবার বিশ্বব্যাপী এই দিবস পালন করা হয়। এবারের প্রতিপাদ্য— ‘শক্তি ও পুষ্টিতে ভরপুর ডিম’।
গত এক দশকে দেশে ডিমের উৎপাদন দ্বিগুণ হয়েছে। সবশেষ গত অর্থবছরে (২০২৪-২৫) দুই হাজার ৪৪০ কোটি পিসেরও বেশি ডিম উৎপাদন হয়েছে দেশে। দশ বছর আগে ২০১৫-১৬ অর্থবছরে যার পরিমাণ ছিল এক হাজার ১৯১ কোটি পিস। বর্তমানে দেশে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৪ কোটি পিস ডিম উৎপাদন হচ্ছে।
খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, উৎপাদনের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে ডিমের চাহিদা বাড়ছে। এখন বহু ধরনের খাদ্যপণ্যে ডিমের ব্যবহার বেড়েছে। যে কারণে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে এসে ডিমের বাজার দাঁড়িয়েছে প্রায় ২৫ হাজার কোটি টাকায়।
পোল্ট্রি খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, খাদ্য নিরাপত্তায় বাংলাদেশে ডিম একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। এর পেছনে বড় অবদান ছোট-বড় উদ্যোক্তাদের। তারা নানান প্রতিকূল পরিবেশেও এ ব্যবসায় টিকে রয়েছেন এবং ডিমের সরবরাহ ব্যবস্থাকে একটি স্থিতিশীলতার বলয়ে রেখেছেন।
ডিমের উৎপাদন বৃদ্ধি এবং দাম সহনীয় হওয়ায় দেশে ডিমের চাহিদাও এখন বেশি। প্রতিটি পরিবারেই ডিম খাওয়ার বিষয়ে বাড়তি সচেতনতা তৈরি হয়েছে। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) মতে, পুষ্টি চাহিদা পূরণ এবং সুস্বাস্থ্যের জন্য প্রতিটি মানুষের বছরে ন্যূনতম ১০৪টি ডিম খাওয়া প্রয়োজন। প্রণিসম্পদ অধিদপ্তর বলছে, এখন মাথাপিছু গড়ে ১৩৭টি ডিমের সহজলভ্যতা রয়েছে।
২০১৯-২০ অর্থবছরে ডিমের বাজার ছিল প্রায় সাড়ে ১২ হাজার কোটি টাকার। যেটা ২০২৪-২৫ অর্থবছরে এসে প্রায় ২৫ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছেছে
বাংলাদেশ প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের লক্ষ্যমাত্রায় ২০৩১ সাল নাগাদ ডিমের মাথাপিছু ভোগ ১৬৫টি এবং ২০৪১ সাল নাগাদ তা ২০৮টিতে উন্নীত করা হবে।
এ পরিস্থিতির মধ্যেই প্রতি বছরের মতো এবারও বাংলাদেশে নানা আয়োজনের মধ্য দিয়ে পালিত হচ্ছে ‘বিশ্ব ডিম দিবস’। দেশের পোল্ট্রি খাতের বৃহৎ উদ্যোক্তাদের সংগঠন বিপিআইসিসি এবং ওয়াপসা- বাংলাদেশ শাখার যৌথ আয়োজনে আজ বিশ্ব ডিম দিবস-২০২৫ পালন করা হবে।
দেশের ৮৮ থেকে ৯০ শতাংশ ডিম আসে ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক খামার থেকে। বিপিআইসিসির হিসাব মতে, বর্তমানে প্রতি পিস ডিমের উৎপাদন খরচ প্রায় ১০.৫০ টাকা
১৯৯৬ সালে অনুষ্ঠিত আই.ই.সি ভিয়েনা কনফারেন্স থেকে এই ডিম দিবস পালন করা হচ্ছে। দিবসটি ঘিরে বিশ্বব্যাপী চলছে একটি ইতিবাচক ক্যাম্পেইন। যার মধ্য দিয়ে বিশ্বের মানুষের পুষ্টি চাহিদা পূরণে ডিমের প্রয়োজনীয়তার বার্তা সবার কাছে পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে। প্রতিবছর অক্টোবরের দ্বিতীয় শুক্রবারে বিশ্বজুড়ে পালিত হয় ‘বিশ্ব ডিম দিবস’।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ডিমকে বলা হয়ে থাকে পরিপূর্ণ খাদ্য বা সুপার ফুড। সারা পৃথিবীতে মাত্র কয়েকটি খাদ্যকে সুপার ফুড হিসেবে আখ্যা দেওয়া হয়- যার মধ্যে ডিম অন্যতম। ভিটামিন ও মিনারেলে সমৃদ্ধ এমন একটি প্রাকৃতিক আদর্শ খাবার পৃথিবীতে খুব কমই আছে। বাজারে এখন বিভিন্ন ধরনের ভ্যালু-অ্যাডেড ডিম পাওয়া যাচ্ছে। যেমন- ওমেগা-থ্রি ডিম, কিডস এড, সেলেনিয়াম সমৃদ্ধ ডিম, ফোলেট এগ ইত্যাদি।
কয়েক বছর আগে জাপানের ‘ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব অ্যাডভান্স ইন্ডাস্ট্রিয়াল সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজির (এ.আই.এস.টি) গবেষকরা এমন একটি মুরগির জাত উদ্ভাবন করেছেন যে মুরগির ডিম ক্যানসার প্রতিরোধে সক্ষম হবে।
খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ২০১৯-২০ অর্থবছরে ডিমের বাজার ছিল প্রায় সাড়ে ১২ হাজার কোটি টাকার। যেটা ২০২৪-২৫ অর্থবছরে এসে প্রায় ২৫ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছেছে। এই যে ডিমের উৎপাদন এবং বড় বাজার তৈরি হয়েছে এখানে ছোট ছোট খামারিদের সঙ্গে বড় একটি হিস্যা রয়েছে করপোরেট উৎপাদনকারীদের। যেখানে বড় উৎপাদনকারীরা হাজার হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ করেছেন।
ডিম উৎপাদন বাড়ছে ঠিকই, কিন্তু খামারিদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা জরুরি হয়ে পড়েছে। ফিডের দাম অনেক বেশি, এ কারণে অনেকে ছিটকে পড়ছেন। এ খাতে অনেক কর্মসংস্থান রয়েছে। সরকারের নীতি সহায়তা ছাড়া খামারিরা টিকে থাকতে পারবে না।- তাহের আহমেদ সিদ্দিকী
প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের হিসাব বলছে, বাজারে বড় প্রতিষ্ঠানগুলোর উৎপাদন ২০ শতাংশের আশপাশে।
জানা গেছে, কাজী ফার্মস, ডায়মন্ড এগ, প্যারাগন পোল্ট্রি, নর্থ এগ, সিপি বাংলাদেশ, আফিল অ্যাগ্রো, পিপলস পোল্ট্রি, নবিল অ্যাগ্রো, ভিআইপি শাহাদত, রানা পোল্ট্রি, ওয়েস্টার পোল্ট্রিসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান রয়েছে উৎপাদনের শীর্ষে। এর মধ্যে কিছু কোম্পানি রয়েছে যাদের দৈনিক ডিম উৎপাদন ১৫ লাখ পিসের কাছাকাছি। অনেকগুলো কোম্পানি প্রতিদিন প্রায় ৪-৫ লাখ পিস ডিম উৎপাদন করছে।
এর মধ্যে এখন সাধারণ ডিমের পাশাপাশি করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলো ওমেগা-থ্রি ডিম, কিডস এড, সেলেনিয়াম সমৃদ্ধ ডিম ও ফোলেট এগ উৎপাদন শুরু করেছে।
ডিমের উৎপাদনে ছোট ও বড় খামারিবাংলাদেশে মোট যে পরিমাণ বাণিজ্যিক পোল্ট্রি ডিম উৎপাদিত হয় তার মাত্র ১০ থেকে ১২ শতাংশ উৎপাদন করে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে পরিচিত খামারগুলো। অর্থাৎ, দেশের ৮৮ থেকে ৯০ শতাংশ ডিম আসে ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক খামার থেকে। বিপিআইসিসির হিসাব মতে, বর্তমানে প্রতি পিস ডিমের উৎপাদন খরচ প্রায় ১০ দশমিক ৫০ টাকা।
বাংলাদেশ এগ প্রডিউসারস অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি তাহের আহমেদ সিদ্দিকী বলেন, ‘ডিম উৎপাদন বাড়ছে ঠিকই, কিন্তু খামারিদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা জরুরি হয়ে পড়েছে। ফিডের দাম অনেক বেশি, এ কারণে অনেকে ছিটকে পড়ছেন। এ খাতে অনেক কর্মসংস্থান রয়েছে। সরকারের নীতি সহায়তা ছাড়া খামারিরা টিকে থাকতে পারবে না।’
প্রাণিসম্পদ অধিদফতরের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বর্তমানে দেশে যে পরিমাণ ডিম উৎপাদন হয়; তাতে চাহিদা মেটানোর পরও অতিরিক্ত থাকার কথা।
প্রতিষ্ঠানটির মহাপরিচালক ড. মোহাম্মদ আবু সুফিয়ান বলেন, প্রায় ৬ কোটি ৫০ লাখের বেশি ডিম প্রতিদিন বাজারে আসছে। একজন মানুষের জন্য সপ্তাহে দুটি ডিমকে ন্যূনতম চাহিদা হিসেবে ধরে বছরে ১০৪টি ডিম প্রয়োজন বলে অনুমান করা হয়েছিল। তবে এখন প্রায় ১৩৭-১৩৮টি ডিম বাজারে সরবরাহ করতে পারছি। উৎপাদন আরও বাড়ানোর চেষ্টা চলছে।
চাহিদা-জোগান সমীকরণে উদ্বৃত্ত হিসাব থাকার পরও অনেক ভোক্তার কাছেই পণ্যটির দাম বেশি বলে মনে হয়। ভোক্তারা বলেন, ডিম মানুষের নিত্যদিন প্রয়োজন হলেও হঠাৎ করে মাঝেমধ্যে দাম বেড়ে যায়; যা সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যায়।
কম দামে ডিম খেতে চাওয়া ভোক্তার প্রত্যাশা পূরণের পথও দেখিয়ে দিচ্ছেন কৃষি অর্থনীতিবিদরা। তাদের যুক্তি, বিপণন কাঠামোতে মধ্যস্বত্বভোগীদের ঠেকাতে পারলেই কমবে দাম।
কৃষি অর্থনীতিবিদ নজরুল ইসলাম খান বলেন, সবজির চেয়ে ডিমের সিন্ডিকেট বেশি ভয়াবহ, যা একটি বিশেষ শ্রেণি নিয়ন্ত্রণ করছে। সরকার তা নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে না। সরকার পদক্ষেপ নিলে ডিমের বাজারে সংকট হওয়ার কথা না। কারণ ডিম উৎপাদন হচ্ছে বাণিজ্যিকভাবে এবং কৃষক পর্যায়ে, কিন্তু দেশে ডিমের সুষ্ঠু বাজার ব্যবস্থা নেই।
একদিকে, উৎপাদন খরচ মিটিয়ে উৎপাদককে টিকিয়ে রাখা অন্যদিকে সাশ্রয়ী মূল্যে ডিমের সরবরাহ বাড়াতে খাত সংশ্লিষ্টদের নিয়ে সরকার কাজ করছে বলে জানিয়েছেন প্রাণিসম্পদের মহাপরিচালক। তিনি বলেন, জনগণকে কীভাবে আরও সুলভ মূল্যে ডিম সরবরাহ করা যায় তা নিয়ে কাজ করছে প্রাণিসম্পদ অধিদফতর।
বর্তমানে সপ্তাহে জনপ্রতি দুইটি করে ডিম ধরে যে চাহিদা নির্ধারণ করা হয়েছে, আগামীতে তা বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে বলেও জানিয়েছে প্রাণিসম্পদ অধিদফতর।
উল্লেখ্য, বর্তমানে রাজধানীর বাজারে প্রতি ডজন লাল ডিম ১৩৫-১৪০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। আর প্রতি ডজন সাদা ডিমের জন্য গুনতে হচ্ছে ১২৫-১৩০ টাকা।
পুষ্টিবিদদের মতে, ডিম এমন একটি খাবার যাতে শরীরের প্রয়োজনীয় প্রায় সব ধরনের পুষ্টি উপাদানই রয়েছে। সহজলভ্য ও সাশ্রয়ী এই খাদ্যটি শিশু থেকে বৃদ্ধ-সব বয়সের মানুষের সুস্থতায় ভূমিকা রাখে।






