
সারাদেশের ন্যায় উত্তরাঞ্চলের বিভিন্ন জায়গায় গত কয়েকদিনের বৈরী আবহাওয়ায় জনজীবন অতিষ্ঠ, বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। মৌসুমী ঝড়ো হাওয়া ও ভারী বৃষ্টিপাতে চলতি মৌসুমের পাকা-আধাপাকা আমনধানসহ শীতকালীন বিভিন্ন জাতের রবি ফসলের ‘ব্যাপক’ ক্ষতি সাধিত হয়েছে। লাগাতার অনবরত বৃষ্টি ও দমকা হাওয়ায় কৃষকের মুখের হাসি ম্লান হয়ে নেমে এসেছে হতাশায়।
নীলফামারীর ডিমলা উপজেলা উত্তর কুমার পাড়া গ্রামের বাসিন্দা কৃষক মো, লেবু মিয়া বলেন, ‘ঝড়িতে(বৃষ্টি) শুধু আমন ধানই নয়, শীতকালীন রবি শস্য, মুলা, ফুলকপি, বাঁধাকপি, গাজর, লাল শাক, পালং শাক, পুঁইশাকসহ বিভিন্ন জাতের শাকসবজির ক্ষেতও পানিতে তলিয়ে গেছে। অনেক জায়গায় জমির মাটি নরম হয়ে গিয়ে গাছ উপড়ে পড়েছে। আবার অনেক শাকসবজি তলা পানিতে তলিয়ে পচে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে।’
খালিশা চাপানী গ্রামের কৃষক মিজানুর রহমান জানান, আমন ধান কাটার পূর্ব মুহূর্তে এমন বৃষ্টির ও দমকা হাওয়ার কারণে সব কিছু এলোমেলো হয়ে গেল। ফসল ঘরে তুলতে না পারলে পরিবার পরিজন নিয়ে না খেয়ে মরতে হবে। কি করবো সেটাই ভেবে পাচ্ছি না।
রংপুরের পীরগাছা উপজেলার পাওটানা গ্রামের কৃষক কামরুল হাসান জানান, আগের চেয়ে সার, বীজ, শ্রমিকের দাম বেড়েছে। এবার বৃষ্টিতে ফসল নষ্ট হওয়ায় পুরো পরিবার নিয়ে দুশ্চিন্তায় আছি। এভাবে চললে কৃষি থেকে মানুষ মুখ ফিরিয়ে নেবে।
ফুলছড়ি উপজেলার চর উজালডাঙ্গার কৃষক সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘দেড় বিঘা জমিতে ফুলকপি আর টমেটোর চারা লাগাইছিলাম। টানা বৃষ্টিতে এখন সব পানির নিচে। কিছুই আর বাঁচানো যাবে না। নতুন করে লাগাতে গেলে বীজ, সার আর শ্রমিকের খরচ মেটাতে কুলাবে না।’
একই এলাকার আরেক কৃষক সাদ্দাম হোসেনী জানান, আমরা আশা করছিলাম এই বছর চর এলাকায় ভালো সবজি হবে। এখন বীজ পচে গেছে। আবার চাষ করতে গেলে সময় লাগবে, আর তখন বাজারে দামের সুযোগ থাকবে না।
সাঘাটার দিঘলকান্দি চরের শামসুল হক সরকার বলেন, ‘মরিচের বীজ জমিতে ছিটিয়ে দেওয়া হয়েছিল, গাছও গজানোর উপক্রম, কিন্তু বৃষ্টিতে সববীজ মাটির নীচে চাপা পড়েছে।’
চাষীরা জানান, এর ফলে ক্ষুদ্র ও মাঝারি কৃষকরা মারাত্মক আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছেন।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, বৃষ্টির কারণে উত্তরাঞ্চলের কৃষকরা পড়েছেন চরম বিপাকে। টানা বৃষ্টিপাতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে গাইবান্ধা, কুড়িগ্রাম, লালমনিরহাট ও রংপুর জেলার বিশাল এলাকার শীতকালীন সবজি চাষ। বীজ রোপণ ও চারা রোপণের পরপরই বৃষ্টি হওয়ায় মাঠজুড়ে জমে থাকা পানিতে ডুবে গেছে ফসলের জমি। এতে কৃষকদের মুখে নেমে এসেছে হতাশার ছাপ, শীতকালীন ফসল উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন নিয়ে দেখা দিয়েছে গভীর শঙ্কা।
রংপুর বিভাগের কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, চলতি শীত মৌসুমে বিভাগজুড়ে তিস্তা, ব্রহ্মপুত্র ও যমুনা নদীর তীরবর্তী ও চরাঞ্চলজুড়ে প্রায় ১ লাখ ১০ হাজার হেক্টর জমিতে শীতকালীন সবজি চাষাবাদের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল। এর মধ্যে গাইবান্ধা জেলায় ২৮ হাজার, কুড়িগ্রামে ২৫ হাজার, লালমনিরহাটে ২০ হাজার এবং রংপুর জেলায় ৩৭ হাজার হেক্টর জমিতে সবজি চাষের লক্ষ্য নেয়া হয়। কিন্তু অক্টোবরের শেষ সপ্তাহে শুরু হওয়া অস্বাভাবিক বৃষ্টিপাতে এই অঞ্চলের কৃষকেরা পড়েছেন চরম ক্ষতির মুখে।
গাইবান্ধার ফুলছড়ি, সুন্দরগঞ্জ, সাঘাটা ও সদর উপজেলার চরাঞ্চলে মাঠ পরিদর্শনে দেখা গেছে, টানা তিন দিনের বৃষ্টিতে চাষ করা ফুলকপি, বাঁধাকপি, টমেটো, বেগুন, মিষ্টি কুমড়া, মিষ্টি আলু ও মরিচের চারা নষ্ট হয়ে গেছে। অনেক জায়গায় মাঠের জমিতে হাঁটুপানি জমে আছে, কোথাও আবার জমিতে বীজ পচে গেছে।

গাইবান্ধা জেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেছে, জেলার সাতটি উপজেলার মধ্যে সুন্দরগঞ্জ, ফুলছড়ি ও সাঘাটা উপজেলার চরাঞ্চল সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এখন পর্যন্ত প্রায় ৬হাজার ৫০০ হেক্টর জমির সবজি ও শস্য আংশিক বা সম্পূর্ণ ক্ষতির শিকার হয়েছে।
কৃষকেরা বলছেন, একদিকে কৃষি উপকরণের দাম বেড়েছে, অন্যদিকে প্রাকৃতিক দুর্যোগে ফসল বিনষ্ট হওয়ায় তারা এখন দিশেহারা।
সাঘাটার সহকারী কৃষি কর্মকর্তারা মির্জা নয়ন বলেন, ‘এই অপ্রত্যাশিত বৃষ্টিপাত মূলত জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব। সাধারণত অক্টোবরের শেষ দিকে উত্তরাঞ্চলে বৃষ্টিপাত থাকে খুবই সীমিত, কিন্তু এবার মৌসুমের শেষ প্রান্তে অস্বাভাবিকভাবে কয়েক দিন ধরে ভারী বর্ষণ হয়েছে। এতে মাঠের জমিতে জলাবদ্ধতা তৈরি হয়ে ফসলের ক্ষতি হয়েছে।’
গাইবান্ধা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক (ডিডি) কৃষিবিদ আতিকুল ইসলাম বলেন, ‘বৃষ্টিতে শীতকালীন সবজির কিছুটা ক্ষতি হয়েছে, তবে বৃষ্টি এই ক্ষতি চাষীরা পুষিযে নিতে পারবে।’
তিনি আরো বলেন, ‘রংপুর বিভাগের চরাঞ্চলজুড়ে চাষাবাদের জমিগুলো সাধারণত উঁচু-নিচু। নিচু জমিগুলোতে পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা না থাকায় সেগুলোতেই সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে। তবে পানি নেমে গেলে কৃষকদের নতুন করে চারা রোপণের পরামর্শ দেয়া হচ্ছে।’
তিনি আরও জানান, ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের জন্য পুনর্বাসন কর্মসূচি হাতে নেওয়া হচ্ছে। এতে তাদের বিনা মূল্যে বীজ, সার ও প্রযুক্তিগত সহায়তা দেয়া হবে যাতে তারা পুনরায় চাষে ফিরতে পারেন।
অন্যদিকে, কৃষি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে আবহাওয়ার ধরন পাল্টে যাচ্ছে। এক সময় যেসব ফসলের মৌসুম নির্দিষ্ট ছিল, এখন তা আর স্থিতিশীল থাকছে না। তাই কৃষি পরিকল্পনা ও বীজ বপনের সময়সূচি নতুনভাবে নির্ধারণ করা দরকার।
রংপুর কৃষি অঞ্চলের আঞ্চলিক কৃষি গবেষণা কেন্দ্রের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. শফিকুল ইসলাম বলেন, ‘আমাদের কৃষকদের এখন জলবায়ু সহনশীল ফসলের দিকে যেতে হবে। একই সঙ্গে ড্রেনেজ ব্যবস্থার উন্নয়ন ও উঁচু জমিতে চাষের অভ্যাস গড়ে তোলা জরুরি। নাহলে প্রতি বছর এমন ক্ষতি ঘটবে।’
কৃষিবিদদের মতে, এই ক্ষতির প্রভাব শুধু কৃষকের নয়, পুরো বাজার ব্যবস্থার ওপরও পড়বে। কারণ, উত্তরাঞ্চল দেশের বড় সবজির জোগানদাতা অঞ্চল। এখানকার সবজি ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় পাঠানো হয়। উৎপাদন কমে গেলে বাজারে সবজির দামও বেড়ে যেতে পারে।






