বাংলাদেশের তরুণ নারী উদ্যোক্তদের চোখে ‘আইকন’ ব্যক্তিত্ব। মেধা,প্রজ্ঞা,মননশীলতা ও কর্মনিষ্ঠায় যিনি নিজেকে অনন্য উচ্চতায় প্রতিষ্ঠিত করেছেন তিনি আফসিয়া জান্নাত সালেহ। তিনি নিজেকে নারীত্বের গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ না রেখে ভেঙ্গেছেন ‘রক্ষণশীলতা’, হয়েছেন আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন শিল্প পরিবার সায়মন গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক(এমডি)। তিনি এক হাতে ঘর সামলে অন্য হাতে ব্যবসা সামলান। নিতে জানেন একের পর এক চ্যালেঞ্জ, সফলতাও পেয়েছেন তিনি। যখন যে কাজেই হাত দিয়েছেন, পেয়েছেন বিস্ময়কর সাফল্য।
আফসিয়া জান্নাত সালেহর পিতা মরহুম এম এ মোহাইমেন সালেহ। মোহাইমেন সালেহ ছিলেন প্রতিষ্ঠিত বিজনেস লিডার, ছিলেন আটাব ও হাবের সফল সভাপতি, ঢাকা চেম্বার অব কমার্স এন্ড ইন্ডাস্ট্রি (ডিসিসিআই)-এর পরিচালক ও লায়ন্স ক্লাবের গভর্নর। পিতার দেখানো পথেই এগিয়ে চলছেন কন্যা আসফিয়া। তাদের প্রতিষ্ঠিত সায়মন হলিডেজ ও সায়মন ওভারসিজ লি:বাংলাদেশের সকলের কাছে অতি পরিচিত একটি ট্রাভেল সেবা দানকারি প্রতিষ্ঠান যা সায়মন গ্রুপ অব কোম্পানিজ এর একটি সহযোগি প্রতিষ্ঠান।
এছাড়াও ৪৬ বছরের ইতিহাসে প্রথম নারী মহাসচিব হিসেবে সাড়ে ৪ হাজারেরও বেশি ট্রাভেল এজেন্সি নিয়ে গঠিত বাণিজ্যিক সংগঠন এসোসিয়েশন অব ট্র্যাভেল এজেন্টস অব বাংলাদেশের (আটাব) এর নেতৃত্ব দিয়েছেন আফসিয়া জান্নাত সালেহ। তার আগে তিনি ওই সংগঠনের প্রথম সহ-সভাপতি ছিলেন।
আফসিয়া জান্নাত সালেহ’র শিক্ষা জীবন ছিল অত্যান্ত কৃতিত্বপূর্ণ। অত্যন্ত তীক্ষ্ম জ্ঞানের অধিকারী আফসিয়া নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়(এনএসইউ) থেকে অর্থনীতিতে বিএসএস ও এমবিএ ডিগ্রী অর্জন করেন। তিনি বাংলাদেশ স্কাউট ফাউন্ডেশন এর আজীবন সদস্য। তিনি একজন শুধু সফল নারী উদ্যোক্তা নয়, একজন সফল সমাজ সেবকও। তিনি প্রশান্তি ইউকে (যুক্তরাজ্যের একটি এনজিও এর মাধ্যমে স্বাস্থ্য প্রকল্প ও মাতৃসদন) মোহাইমেন সালেহ ফাউন্ডেশন (গৃহহীন গরীব বাস্তুহারাদের গৃহ প্রদান প্রকল্প) এবং অন্যান্য সামাজিক কর্মকান্ডে আর্থিক সাহায্য করে থাকেন।
কাজের স্বীকৃতি স্বরূপ পেয়েছেন সেরা ট্রাভেল অপারেটর, সেরা নারী উদোক্তা, বেস্ট উইমেন লিডার ইন ট্রাভেল ইন্ডাস্ট্রি, বেস্ট ট্রাভেল এজেন্ট অ্যাওয়ার্ডসহ অসংখ্য পুরস্কার। নিজের ব্যবসার পাশাপাশি এভিয়েশন সেক্টর নিয়ে অবাধ ভাবনা তার। দেশের এভিয়েশন সেক্টরের সম্ভাবনার কথা বলতে গিয়ে আফসিয়া জান্নাত সালেহ বলেন, ‘ভৌগলিক অবস্থানের কারণে এই দেশই হবে আন্তর্জাতিক উড়োজাহাজ পরিবহনের হাব। পৃথিবীতে বিভিন্ন সময় কিছু পরিবর্তন হয় যেমন একসময় হংকং ছিল আন্তর্জাতিক হাব, এরপর হলো সিঙ্গাপুর, থাইল্যান্ড এখন দুবাই। আমি বিশ্বাস করি পূর্ব ও পশ্চিমের আকাশ পথের মধ্যবর্তী হওয়ায় এক সময় আমাদের কক্সবাজার বা হযরত শাহজালাল হবে আন্তর্জাতিক আকাশ পরিবহণ হাব আর রিফুয়েলিংয়ের জন্যই এখানে সবাই আসবে।’
দেশের পর্যটন শিল্পের সমস্যা ও সম্ভাবনা প্রসঙ্গে তার মন্তব্য; সাগরের গর্জন, পাহাড়ের নীরবতা আর হাওরের সৌন্দর্য সবই আছে আমাদের দেশে। এর সাথে কোথাও আবার প্রাচীন প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন(বগুড়ার মহাস্থানগড়,পাহাড়পুর বৌদ্ধ বিহার অথবা কুমিল্লার মায়নামতি বিহার) মাঝে হেঁটে চলা বৈচিত্র্যময় আমাদের এই দেশ পর্যটনের রয়েছে অপার সম্ভাবনা। তবে এই সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে ছোট ছোট অবকাঠামো, মানসম্মত রাস্তা, নিরাপত্তা ব্যবস্থা, পর্যটন শিল্পের সমন্বয়হীনতা ও দক্ষ জনবলের অভাব দূর করতে হবে। সরকার ট্যুরিজম মাস্টার প্ল্যান হাতে নিয়েছে এবং এর বাস্তবায়নের মধ্যে দিয়ে বাংলাদেশে ট্যুরিজমের বিকাশ সম্ভব হবে।
দেশে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের সবচেয়ে সহজ পথ হচ্ছে পর্যটন খাতকে বিশ্বের বুকে যদি সঠিকভাবে তুলে ধরা। বিদেশী পর্যটকদের আমাদের দেশে আকর্ষন করাতে হলে সেবার মান বাড়াতে হবে। আসফিয়া জান্নাত বলেন,‘বাংলাদেশের পর্যটনকেন্দ্র হয় প্রকৃতি কেন্দ্রিক, আর না হলে প্রত্নতত্ত্বকেন্দ্রিক। শুধু এই দুটির আকর্ষণ দেখিয়ে ট্যুরিস্ট টানা যাবে না। এই দুইয়ের সঙ্গে সেবার মান যোগ করতে হবে।’
এছাড়া, বর্তমানে ঢাকা থেকে সুন্দরবন যেতে এখন আমাদের সময় লাগছে চার ঘণ্টা। আর দক্ষিণাঞ্চলের যে কোন জায়গায় যেতে তিন থেকে পাঁচ ঘণ্টায় প্রয়োজন। এমনকি দক্ষিণাঞ্চলের কুয়াকাটা পর্যন্ত পাঁচ ঘন্টায় যাওয়া সম্ভব। এক্ষেত্রে দক্ষিণাঞ্চলে পর্যটনের ব্যাপক সাড়া আমরা তৈরি হয়েছে। আর বর্তমানে পৃথিবীর বৃহত্তর ম্যানগ্রভ বন সুন্দরবনের আকর্ষণ আরো বাড়ছে, সেখানে এখন অনেক রিসোর্ট হচ্ছে, অনেক হোটেল হচ্ছে, নৌযান, নৌবিহার, নদীমাতৃক পর্যটন করার জন্য সেখানে আয়োজন কিন্তু এখন চলছে। এই জায়গাগুলো আরো প্রোমোট করা, আমাদের বিদেশী মিশনগুলো যদি দেশের বিভিন্ন জায়গায় বিস্তারিত তুলে ধরে তবে ফরেন টুরিষ্ট বৃদ্ধি পাবে। এতে একদিকে যেমন কর্মসংস্থান বাড়বে অন্যদিকে বৈদেশিক মুদ্রা আয় করা সম্ভব হবে।
দেশের অর্থনীতিতে বেসরকারি পর্যটন শিল্পের ভূমিকা বিষয়ে তিনি বলেন, ‘আমাদের পাশ্ববর্তী দেশ ভারত, শ্রীলঙ্কা, নেপাল, থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া এ সকল দেশের ট্যুরিজম তাদের অর্থনীতিতে বিরাট ভূমিকা রেখে চলেছে। তুলনামূলকভাবে আমাদের দেশে এখনও সেরকম অবকাঠামো, ট্যুরিষ্ট স্পটগুলোকে সাজানোসহ আনুষঙ্গিক অনেক কিছুর ঘাটতি থাকায় বেসরকারি পর্যটন খাত অর্থনৈতিকভাবে অগ্রসর হতে পারেনি। তবে ইনবাউন্ড ট্যুরিজম যখন ডেভেলপড করবে, তখন আমাদের বেসরকারি পর্যটন ও দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে বেশি অবদান রাখতে পারবে।’







