
সব জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটিয়ে ২০২৬ সালের পুরুষদের ব্যালন ডি’অর পুরস্কারটি জয় করেছেন বায়ার্ন মিউনিখ ও ইংল্যান্ডের তারকা স্ট্রাইকার হ্যারি কেইন। ২৬ অক্টোবর ২০২৬ দিবাগত রাতে লন্ডনের প্যালাডিয়াম থিয়েটারে জমকালো অনুষ্ঠানের মাধ্যমে তার নাম ঘোষণা করা হয়।
২০০১ সালে মাইকেল ওয়েনের পর তিনি প্রথম ইংলিশ ফুটবলার হিসেবে এই মর্যাদাপূর্ণ ট্রফি অর্জন করলেন। তার এই জয়ের পেছনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রেখেছে অসাধারণ গোলস্কোরিংয়ের ধারাবাহিকতা এবং বায়ার্ন মিউনিখের ট্রফি জয়।
পুরো মৌসুমে ক্লাব ও জাতীয় দল মিলিয়ে মোট ৭৩টি গোল করেছেন। আধুনিক ফুটবলে এক মৌসুমে এত বেশি গোল করা স্ট্রাইকারদের সংখ্যা হাতেগোনা। বিশ্বকাপের মঞ্চে ভাগ্য বিমুখ হলেও ফুটবলের শ্রেষ্ঠতম মুকুট আজ কেইনেরই মস্তকে।
কেইনের ক্যারিয়ার জুড়ে একটাই আক্ষেপ ছিল, কোনো দলীয় বড় ট্রফি না থাকা। বায়ার্ন মিউনিখের হয়ে জার্মান বুন্দেসলিগা এবং ডিএফবি-পোকাল ডাবল জয়ের মাধ্যমে তিনি সেই খরা কাটান। এই ট্রফি জয় এবং তার ব্যক্তিগত গোলবন্যা আন্তর্জাতিক সাংবাদিকদের ভোট পাওয়ার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় ফ্যাক্টর হিসেবে কাজ করেছে।
ব্যালন ডি’অর হলো ফুটবল বিশ্বের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ ব্যক্তিগত পুরস্কার। ১৯৫৬ সাল থেকে ফরাসি সাময়িকী ‘ফ্রান্স ফুটবল’ এই পুরস্কার প্রদান করে আসছে। ফরাসি ক্রীড়া লেখক-সাংবাদিক গাব্রিয়েল আনোর পরিকল্পনায় এবং ফ্রান্স ফুটবলের উদ্যোগে ১৯৫৬ সালে প্রথম ব্যালন ডি’অর দেওয়া হয়।
ফ্রান্সের কিলিয়ান এমবাপে এবং স্পেনের লামিন ইয়ামালকে পেছনে ফেলে তিনি এই শীর্ষস্থান অর্জন করেন। এই দুজনের এখনো এই পুরস্কার অর্জনের তালিকায় নাম লেখানো হয়নি।
রিয়াল মাদ্রিদের ফরাসি ফরোয়ার্ড এমবাপে দ্বিতীয় স্থান অর্জন করেছেন। রিয়াল মাদ্রিদে যোগ দেওয়ার প্রথম মৌসুমেই তিনি লা লিগা এবং চ্যাম্পিয়ন্স লিগে দুর্দান্ত ছন্দে ছিলেন। ব্যক্তিগত ও দলীয়ভাবে রিয়াল মাদ্রিদের হয়ে সফল মৌসুম পার করলেও গোলস্কোরিং সংখ্যায় তিনি হ্যারি কেইনের চেয়ে বেশ পেছনে ছিলেন। তাছাড়া কেইনের মতো ট্রফি জয়ের গৌরব এমবাপের পক্ষে ছিল না, যা সাংবাদিকদের ভোটে প্রভাব ফেলেছে।
দীর্ঘ প্রায় দেড় দশক ধরে আর্জেন্টিনার লিওনেল মেসি আর পর্তুগালের ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর যে একচেটিয়া আধিপত্য ছিল, আগেই তার পরিসমাপ্তি ঘটেছে। এর ফলে বিগত বছরগুলোয় একাধিক ফুটবলারের মধ্যে তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা হচ্ছে এবং নিশ্চিতভাবে কাউকে আগে থেকে বিজয়ী ঘোষণা করা কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে।

কয়েক বছর আগেও ফুটবলবোদ্ধারা আগে থেকেই ধারণা করতে পারতেন, ট্রফিটি মেসি অথবা রোনালদোর হাতেই যাচ্ছে। মেসি সর্বাধিক ৮ বার বিজয়ী হন। সর্বাধিক ১৮ বার মনোনয়ন পান রোনালদো এবং ৫ বার জয়ী হয়েছেন। কিন্তু তারা দুজনেই ইউরোপীয় ফুটবলের মূলমঞ্চ ছেড়ে যাওয়ায় এখন যে কোনো নতুন তারকার জন্য পথ উন্মুক্ত হয়ে গেছে।
যদিও এবারও প্রতিদ্বন্দ্বিতায় ছিলেন মেসি। হয়েছেন পঞ্চম। রোনালদো লড়াইয়ে আর টিকতে না পারায় গেল বছরগুলোয় মেসির প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে উঠে আসেন ক্রোয়েশিয়ার লুকা মোদ্রিচ, নেদারল্যান্ডসের ফিরজিল ফান ডাইক, পোল্যান্ডের রোবের্ত লেভানদফস্কি, ফ্রান্সের কারিম বেনজামা, সেনেগালের সাদিও মানে, নরওয়ের আর্লিং হোলোন্দ, স্পেনের রোদ্রি, ফ্রান্সের উসমান দেম্বেলে, ইংল্যান্ডের হ্যারি কেইনরা।
গত মৌসুমে (২০২৫-২৬) বায়ার্ন মিউনিখ এবং ইংল্যান্ডের অধিনায়ক হ্যারি কেইন সব প্রতিযোগিতা মিলিয়ে অবিশ্বাস্য সব গোল করে বাজিকরদের পছন্দের তালিকায় শীর্ষে ছিলেন। কিন্তু ব্যালন ডি’অরের নিয়ম অনুযায়ী কেবল ব্যক্তিগত পারফরম্যান্সই শেষ কথা নয়, দলগত সাফল্য ও ফেয়ার প্লে সমান গুরুত্বপূর্ণ। সব মিলিয়ে তিনি অন্যদের ছাপিয়ে যান।
এবার তার সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় ছিলেন ফ্রান্সের কিলিয়ান এমবাপে, স্পেনের লামিন ইয়ামাল, রোদ্রি, আর্জেন্টিনার লিওনেল মেসিরা। এদের মধ্যে কেউ ব্যক্তিগত পারফরম্যান্সে এগিয়ে ছিলেন, কেউ ট্রফি জয়ে। ফলে সাংবাদিকদের ভোট দেওয়ার ক্ষেত্রে প্রত্যেকের দৃষ্টিভঙ্গি একেক রকম হয়, যা শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত ফলাফলে অনিশ্চয়তা বজায় রাখে।
২০২২ সাল থেকে পুরো বছরের পরিবর্তে ইউরোপীয় ফুটবল মৌসুমের (আগস্ট থেকে পরের বছরের জুলাই) পারফরম্যান্স বিচার করা হয়। ফলে মে বা জুন মাসে চ্যাম্পিয়ন্স লিগ বা বড় কোনো আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্টের (যেমন ইউরো বা বিশ্বকাপ) ফাইনালে যে খেলোয়াড় চমক দেখান, তিনি হঠাৎ করেই রেসে বাকিদের পেছনে ফেলে দেন।
একথা বলার অপেক্ষা রাখে না, ব্যালন ডি’অর হলো ফুটবল বিশ্বের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ ব্যক্তিগত পুরস্কার। ১৯৫৬ সাল থেকে ফরাসি সাময়িকী ‘ফ্রান্স ফুটবল’ এই পুরস্কার প্রদান করে আসছে। ফরাসি ক্রীড়া লেখক-সাংবাদিক গাব্রিয়েল আনোর পরিকল্পনায় এবং ফ্রান্স ফুটবলের উদ্যোগে ১৯৫৬ সালে প্রথম ব্যালন ডি’অর দেওয়া হয়।
প্রথম বিজয়ী ছিলেন ইংল্যান্ডের স্ট্যানলি ম্যাথুস। তখন এটি শুধু ইউরোপীয় ক্লাবে খেলা ইউরোপীয় ফুটবলারদের জন্য সীমাবদ্ধ ছিল। এ কারণে ব্রাজিলের জিজি, গারিঞ্চা, ব্রাজিলের পেলে, আর্জেন্টিনার মারিও কেম্পেস, ম্যারাডোনা, ব্রাজিলের রোমারিওর মতো বিশ্ব কাঁপানো কিংবদন্তি ফুটবলারদের এই পুরস্কারে সম্মানিত করা যায়নি। অবশ্য ইউরোপীয় হয়েও অনেক বিশ্বখ্যাত ফুটবলার এই পুরস্কার জিততে পারেননি।
১৯৯৫ সালে নিয়ম পরিবর্তন করে ইউরোপে খেলা যেকোনো জাতীয়তার ফুটবলারদের এর আওতায় আনা হয়। প্রথম অ-ইউরোপীয় হিসেবে এই পুরস্কার জেতেন লাইবেরিয়ার জর্জ উইয়াহ। ২০০৭ সালে পুরস্কারটি বিশ্বব্যাপী উন্মুক্ত করা হয় অর্থাৎ বিশ্বের যেকোনো প্রান্তের ফুটবলার এতে যোগ্য বিবেচিত হন।
২০১০ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত ফ্রান্স ফুটবল এবং ফিফা একত্রিত হয়ে ‘ফিফা বালোঁ দর’ নামে পুরস্কার প্রদান শুরু করে। ২০১৫ সালে চুক্তি শেষ হলে ২০১৬ সাল থেকে তারা আবার আলাদা হয়ে যায়। ২০১৮ সালে পুরুষদের পাশাপাশি নারীদের জন্য চালু হয় “ব্যালন ডি’অর ফেমেনিন”।
করোনাভাইরাসের কারণে ২০২০ সালে এই পুরস্কার দেওয়া সম্ভব হয়নি। একমাত্র গোলরক্ষক হিসেবে এই পুরস্কারে বিজয়ী হন সোভিয়েত ইউনিয়নের লেভ ইয়াশিন।
১৯৯৫ সালে নিয়ম পরিবর্তন করে ইউরোপে খেলা যেকোনো জাতীয়তার ফুটবলারদের এর আওতায় আনা হয়। প্রথম অ-ইউরোপীয় হিসেবে এই পুরস্কার জেতেন লাইবেরিয়ার জর্জ উইয়াহ। ২০০৭ সালে পুরস্কারটি বিশ্বব্যাপী উন্মুক্ত করা হয় অর্থাৎ বিশ্বের যেকোনো প্রান্তের ফুটবলার এতে যোগ্য বিবেচিত হন।
২০২৪ সালে ফ্রান্স ফুটবল ও উয়েফা যৌথভাবে পুরস্কারটি আয়োজন শুরু করে। ফিফা র্যাঙ্কিংয়ের শীর্ষ ১০০টি দেশের ১০০ জন অভিজ্ঞ সাংবাদিক নিয়ে ব্যালন ডি’অরের জুরি বোর্ড গঠিত হয়। নারী বিভাগে ভোট দেন শীর্ষ ৫০ দেশের একজন করে সাংবাদিক। ভোটের মূল প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার আগে ৩০ জন ফুটবলারের একটি সংক্ষিপ্ত তালিকা প্রকাশ করা হয়। এই তালিকা তৈরি করে একটি বিশেষ প্যানেল। ১২টি ক্যাটাগরিতে পুরস্কার দেওয়া হলেও প্রধান আকর্ষণ হয়ে উঠেন সেরা পুরুষ ফুটবলার।
ফ্রান্স ফুটবল সাময়িকীর আয়োজনে এ অনুষ্ঠানটি বরাবরই প্যারিসে অনুষ্ঠিত হয়েছে। কিন্তু এবারের ৭০তম পুরস্কার প্রদান অনুষ্ঠানটি লন্ডনে আয়োজন করা হয়। এর কারণ, ১৯৫৬ সালে প্রথম ব্যালন ডি’অর বিজয়ী ইংল্যান্ডের স্ট্যানলি ম্যাথুসের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছিল ব্ল্যাকপুল শহরে। তার প্রতি শ্রদ্ধা থেকেই এবার লন্ডনে অনুষ্ঠিত হয় জমজমাট এই অনুষ্ঠান। মজার ব্যাপার, এবারও ইংল্যান্ডেরই একজন পুরস্কার জিতে আয়োজনের সার্থকতা প্রমাণ করেছেন।
ফুটবল মূলত একটি দলগত খেলা, যেখানে ১১ জন মিলে খেলেন। কিন্তু ব্যালন ডি’অর এককভাবে মাঠের সেরা ফুটবলারকে সম্মানিত করে, যা একজন খেলোয়াড়ের জীবনের অন্যতম বড় ব্যক্তিগত স্বপ্ন।
এটি ফুটবল দুনিয়ায় সর্বোচ্চ ও সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ ব্যক্তিগত স্বীকৃতি, যা একজন খেলোয়াড়ের কোনো মৌসুম বা ক্যারিয়ারের অসামান্য শ্রেষ্ঠত্বকে চিরকালের জন্য ফুটবল ইতিহাসে অমর করে রাখে। এমন অমরত্ব কোন ফুটবলার না পেতে চাইবেন?







