
বিশ্ব আজ এক অস্থিরতার মধ্য দিয়ে অতিক্রম করছে। আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে অবিশ্বাস, সামরিক প্রতিযোগিতা, আঞ্চলিক সংঘাত, অর্থনৈতিক চাপ এবং ভূরাজনৈতিক মেরুকরণ ক্রমেই জটিল হয়ে উঠছে। ফ্রান্সসহ ইউরোপের নিরাপত্তা-উদ্বেগ, সৌদি আরব ও উপসাগরীয় অঞ্চলের কৌশলগত হিসাব, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত এবং বৃহৎ শক্তিগুলোর পারস্পরিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা—সব মিলিয়ে বিশ্বব্যবস্থায় এক ধরনের স্থায়ী অস্থিরতা তৈরি হয়েছে।
এই অস্থিরতা রাষ্ট্রগুলোর রাজনৈতিক সম্পর্ককে প্রভাবিত ব্যাপকভাবে। এমনকি এর অভিঘাত পড়ছে বিশ্ব অর্থনীতি, জ্বালানি সরবরাহ, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, খাদ্যনিরাপত্তা এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ওপর।
বর্তমান বিশ্বের সংকটের সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক হলো, কোনো একটি অঞ্চলের অস্থিরতা আর সেই অঞ্চলের ভৌগোলিক সীমানার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকছে না। মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত বাড়লে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে চাপ সৃষ্টি হতে পারে। গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথে বিঘ্ন ঘটলে পণ্য পরিবহনের ব্যয় বাড়ে, সরবরাহব্যবস্থা বাধাগ্রস্ত হয় এবং বিশ্ববাজারে মূল্যবৃদ্ধির আশঙ্কা দেখা দেয়। এর প্রভাব শেষ পর্যন্ত পৌঁছে যায় বাংলাদেশসহ উন্নয়নশীল দেশগুলোর অর্থনীতিতে।
জ্বালানি আমদানির ব্যয় বৃদ্ধি, বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ, মূল্যস্ফীতি এবং রপ্তানি ও বিনিয়োগে অনিশ্চয়তা একটি দেশের অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতাকেও দুর্বল করে দিতে পারে।
অতএব, বিশ্বব্যবস্থার বর্তমান অস্থিরতাকে বিচ্ছিন্ন কিছু রাজনৈতিক ঘটনার সমষ্টি হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি আন্তর্জাতিক ক্ষমতার ভারসাম্য, রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক আন্তঃনির্ভরতা এবং বৈশ্বিক প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যকারিতার সঙ্গে সম্পর্কিত একটি কাঠামোগত সমস্যা।
এই সমস্যা মোকাবিলার একদিকে সাময়িক কূটনৈতিক উদ্যোগ গ্রহণ করা জরুরি অন্যদিকে একটি কার্যকর আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা তৈরি করা জরুরি। মূলত এমন একটি পরিবেশ জরুরি যেখানে রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে প্রতিযোগিতা থাকবে, কিন্তু সেই প্রতিযোগিতা যেন সহজেই যুদ্ধ, অর্থনৈতিক বিপর্যয় কিংবা দীর্ঘস্থায়ী বৈরিতায় রূপ নিতে না পারে।
রাষ্ট্রবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে আন্তর্জাতিক অস্থিরতার অন্যতম প্রধান কারণ হলো রাষ্ট্রগুলোর নিরাপত্তা ও ক্ষমতা অর্জনের প্রতিযোগিতা। আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় এমন কোনো সর্বজনীন সরকার নেই, যার সিদ্ধান্ত সব রাষ্ট্রের ওপর সমানভাবে কার্যকর করা সম্ভব। প্রতিটি রাষ্ট্র নিজের সার্বভৌমত্ব, ভূখণ্ড, অর্থনৈতিক স্বার্থ এবং রাজনৈতিক প্রভাব রক্ষা করতে চায়।
কিন্তু একটি রাষ্ট্র যখন নিজের নিরাপত্তা বাড়ানোর জন্য সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধি করে, তখন অন্য রাষ্ট্র সেটিকে সম্ভাব্য হুমকি হিসেবে বিবেচনা করতে পারে। ফলে প্রতিরক্ষামূলক পদক্ষেপও কখনো কখনো নতুন সংঘাতের কারণ হয়ে ওঠে। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের তত্ত্বে এই পরিস্থিতিকে বলা হয় ‘নিরাপত্তার দ্বিধা’ বা সিকিউরিটি ডিলেমা।
এই দ্বন্দ্বের কারণে রাষ্ট্রগুলো এমন এক প্রতিযোগিতায় জড়িয়ে পড়ে, যেখানে এক পক্ষের নিরাপত্তা বৃদ্ধিকে অন্য পক্ষ নিজের নিরাপত্তার জন্য হুমকি বলে মনে করে। এক রাষ্ট্রের অস্ত্র বৃদ্ধি অন্য রাষ্ট্রের অস্ত্র বৃদ্ধিকে উৎসাহিত করে; সামরিক জোটের সম্প্রসারণ প্রতিপক্ষের পাল্টা জোট গঠনের কারণ হয়; আর পারস্পরিক অবিশ্বাস কূটনৈতিক সমঝোতার পথ সংকুচিত করে। শেষ পর্যন্ত উভয় পক্ষ নিজেদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে গিয়ে সামগ্রিকভাবে আন্তর্জাতিক ব্যবস্থাকে আরও অনিরাপদ করে তোলে।
ফ্রান্স, সৌদি আরব এবং মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য রাষ্ট্রের ভূরাজনৈতিক অবস্থান এক নয়। তাদের নিরাপত্তাগত অগ্রাধিকার, অর্থনৈতিক স্বার্থ এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ধরনও ভিন্ন। কিন্তু এসব রাষ্ট্রের সিদ্ধান্ত বৃহত্তর আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার ওপর প্রভাব ফেলে। ইউরোপের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়লে প্রতিরক্ষা ব্যয়, বাণিজ্যনীতি ও জ্বালানি কৌশলে পরিবর্তন আসতে পারে। অন্যদিকে, উপসাগরীয় অঞ্চলে সংঘাত বা উত্তেজনা বৃদ্ধি পেলে তেল ও গ্যাসের সরবরাহ, সামুদ্রিক পরিবহন, বিনিয়োগ এবং আন্তর্জাতিক বাজারের স্থিতিশীলতা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
রাষ্ট্রবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে আন্তর্জাতিক অস্থিরতার অন্যতম প্রধান কারণ হলো রাষ্ট্রগুলোর নিরাপত্তা ও ক্ষমতা অর্জনের প্রতিযোগিতা। আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় এমন কোনো সর্বজনীন সরকার নেই, যার সিদ্ধান্ত সব রাষ্ট্রের ওপর সমানভাবে কার্যকর করা সম্ভব। প্রতিটি রাষ্ট্র নিজের সার্বভৌমত্ব, ভূখণ্ড, অর্থনৈতিক স্বার্থ এবং রাজনৈতিক প্রভাব রক্ষা করতে চায়।
মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক গুরুত্বের একটি বড় কারণ হলো বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ ও গুরুত্বপূর্ণ নৌপথের সঙ্গে এই অঞ্চলের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক। হরমুজ প্রণালির মতো গুরুত্বপূর্ণ নৌপথে বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটলে তার প্রভাব বিশ্ব অর্থনীতির বহু ক্ষেত্রে ছড়িয়ে পড়তে পারে। জ্বালানির দাম বাড়লে পরিবহন ও উৎপাদন ব্যয় বাড়ে, মূল্যস্ফীতি তীব্র হতে পারে এবং আমদানিনির্ভর অর্থনীতিগুলো চাপে পড়ে। একই সঙ্গে দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত বিনিয়োগকারীদের আস্থা দুর্বল করে এবং ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক পরিকল্পনাকে অনিশ্চিত করে তোলে।
সমস্যা আরও জটিল হয়ে ওঠে যখন আঞ্চলিক বিরোধ বৃহৎ শক্তিগুলোর প্রতিদ্বন্দ্বিতার সঙ্গে যুক্ত হয়। কোনো একটি পক্ষকে সামরিক, অর্থনৈতিক কিংবা কূটনৈতিক সমর্থন দেওয়ার ফলে সংঘাতের ভারসাম্য বদলে যেতে পারে। কখনো এই সমর্থন আগ্রাসন প্রতিরোধে ভূমিকা রাখে, আবার কখনো তা প্রতিদ্বন্দ্বী পক্ষকে পাল্টা পদক্ষেপ নিতে উৎসাহিত করে। এভাবে স্থানীয় সংঘাত বৃহত্তর শক্তির প্রতিযোগিতায় পরিণত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়।
অতএব, বিশ্বকে স্থিতিশীল করতে হলে শুধু সংঘাতের তাৎক্ষণিক কারণগুলো মোকাবিলা করলেই চলবে না; সংঘাত দীর্ঘায়িত হওয়ার পেছনে থাকা রাজনৈতিক, সামরিক ও অর্থনৈতিক প্রণোদনাগুলোও বিবেচনায় নিতে হবে। যুদ্ধবিরতি প্রয়োজন, কিন্তু তার সঙ্গে রাজনৈতিক সমঝোতা, নিরাপত্তার নিশ্চয়তা এবং সংঘাত পুনরায় শুরু হওয়া ঠেকানোর ব্যবস্থাও জরুরি।
বিশ্বব্যবস্থার অস্থিরতা মোকাবিলায় রাষ্ট্রবিজ্ঞানের প্রতিষ্ঠিত তত্ত্বগুলো গুরুত্বপূর্ণ দিকনির্দেশনা দেয়। বাস্তববাদ রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা ও নিরাপত্তার গুরুত্ব ব্যাখ্যা করে। উদার প্রাতিষ্ঠানিকতাবাদ দেখায়, আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান ও নিয়মের মাধ্যমে প্রতিযোগিতার মধ্যেও সহযোগিতা সম্ভব।
জটিল অর্থনৈতিক আন্তঃনির্ভরতার তত্ত্ব ব্যাখ্যা করে, বাণিজ্য, জ্বালানি, প্রযুক্তি ও বিনিয়োগের সম্পর্ক রাষ্ট্রগুলোকে কীভাবে পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত করে। অন্যদিকে, নির্মাণবাদ তুলে ধরে যে রাষ্ট্রগুলোর আচরণ শুধু বস্তুগত স্বার্থ দ্বারা নয়, ইতিহাস, পরিচয়, রাজনৈতিক বক্তব্য এবং পরস্পর সম্পর্কে ধারণার দ্বারাও প্রভাবিত হয়।
এই তত্ত্বগুলো সমন্বিত করে বিশ্বব্যবস্থার স্থিতিশীলতার জন্য একটি কার্যকর কাঠামো নির্মাণ করা যেতে পারে। একে বলা যেতে পারে ‘সমন্বিত বৈশ্বিক স্থিতিশীলতা কাঠামো’। এটিকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ধারণার ভিত্তিতে একটি প্রস্তাবিত নীতিগত কাঠামো হিসেবে ধরে নেওয়া যায়। এই কাঠামোর প্রথম ভিত্তি হবে নিরাপত্তার ভারসাম্য ও ঝুঁকি হ্রাস।
দ্বিতীয় ভিত্তি হবে কার্যকর বহুপক্ষীয় কূটনীতি। রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে বিরোধ দেখা দেওয়ার পর আলোচনা শুরু করার পরিবর্তে বিরোধ বাড়ার আগেই যোগাযোগ ও মধ্যস্থতার ব্যবস্থা সক্রিয় করা প্রয়োজন। জাতিসংঘ, আঞ্চলিক সংস্থা এবং নিরপেক্ষ মধ্যস্থতাকারীরা এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। তবে এসব উদ্যোগের সাফল্য নির্ভর করবে সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্রগুলোর রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং সমঝোতা বাস্তবায়নের ওপর।
তৃতীয় ভিত্তি হবে অর্থনৈতিক স্থিতিস্থাপকতা। আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও পারস্পরিক নির্ভরতা শান্তির প্রণোদনা তৈরি করতে পারে, কিন্তু অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা রাজনৈতিক চাপের হাতিয়ারও হয়ে উঠতে পারে। তাই প্রয়োজন এমন একটি বিশ্ব অর্থনৈতিক ব্যবস্থা, যেখানে দেশগুলো পারস্পরিক বাণিজ্য ও সহযোগিতার সুবিধা পাবে, কিন্তু একটি নির্দিষ্ট রাষ্ট্র, অঞ্চল কিংবা সরবরাহব্যবস্থার সংকটে পুরো অর্থনীতি বিপর্যস্ত হয়ে পড়বে না। জ্বালানি, খাদ্য, ওষুধ এবং গুরুত্বপূর্ণ কাঁচামালের বিকল্প উৎস, সরবরাহব্যবস্থার বৈচিত্র্য এবং সংকটকালীন অর্থায়নের ব্যবস্থা এ ক্ষেত্রে অপরিহার্য।
চতুর্থ ভিত্তি হবে আন্তর্জাতিক আইন ও প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহি। জাতিসংঘ সনদ রাষ্ট্রগুলোর সার্বভৌম সমতা, শান্তিপূর্ণ উপায়ে বিরোধ নিষ্পত্তি এবং বলপ্রয়োগের ওপর বিধিনিষেধের নীতিগত ভিত্তি নির্ধারণ করেছে। কিন্তু আন্তর্জাতিক আইনের কার্যকারিতা নির্ভর করে তার ধারাবাহিক প্রয়োগের ওপর। শক্তিশালী রাষ্ট্রের ক্ষেত্রে এক নিয়ম এবং দুর্বল রাষ্ট্রের ক্ষেত্রে অন্য নিয়ম কার্যকর হলে আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার প্রতি আস্থা কমে যায়। তাই আন্তর্জাতিক আইনকে আরও বিশ্বাসযোগ্য করতে হলে তার প্রয়োগে সামঞ্জস্য, জবাবদিহি এবং কার্যকর বিরোধ নিষ্পত্তির সুযোগ বাড়াতে হবে।
পঞ্চম ভিত্তি হবে মানবিক ও সামাজিক নিরাপত্তা। বিশ্বব্যবস্থার স্থিতিশীলতা কেবল রাষ্ট্রের সামরিক সক্ষমতা কিংবা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ওপর নির্ভর করে না। খাদ্যনিরাপত্তা, কর্মসংস্থান, মৌলিক পণ্যের ক্রয়ক্ষমতা, শরণার্থী সুরক্ষা এবং সামাজিক আস্থাও এর গুরুত্বপূর্ণ অংশ। সংঘাতের ফলে সাধারণ মানুষের জীবন বিপর্যস্ত হলে রাজনৈতিক অসন্তোষ বাড়তে পারে এবং নতুন অস্থিরতার জন্ম হতে পারে। তাই শান্তি প্রতিষ্ঠার উদ্যোগে মানবিক নিরাপত্তাকে কেন্দ্রীয় গুরুত্ব দিতে হবে।
মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক গুরুত্বের একটি বড় কারণ হলো বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ ও গুরুত্বপূর্ণ নৌপথের সঙ্গে এই অঞ্চলের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক। হরমুজ প্রণালির মতো গুরুত্বপূর্ণ নৌপথে বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটলে তার প্রভাব বিশ্ব অর্থনীতির বহু ক্ষেত্রে ছড়িয়ে পড়তে পারে। জ্বালানির দাম বাড়লে পরিবহন ও উৎপাদন ব্যয় বাড়ে, মূল্যস্ফীতি তীব্র হতে পারে এবং আমদানিনির্ভর অর্থনীতিগুলো চাপে পড়ে।
এই পাঁচটি ভিত্তিকে বিচ্ছিন্নভাবে নয়, সমন্বিতভাবে প্রয়োগ করতে হবে। কারণ সামরিক উত্তেজনা কমলেও অর্থনৈতিক চাপ অব্যাহত থাকলে বিরোধ আবার বাড়তে পারে। যুদ্ধবিরতি হলেও রাজনৈতিক সমঝোতা না হলে সংঘাত ফিরে আসতে পারে। আবার অর্থনৈতিক সহযোগিতা থাকলেও একতরফা নির্ভরশীলতা নতুন সংকট তৈরি করতে পারে। স্থিতিশীলতার জন্য তাই প্রয়োজন এমন একটি ব্যবস্থা, যা তাৎক্ষণিক সংঘাত নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি অস্থিরতার কারণগুলোও কমিয়ে আনবে।
বিশ্বব্যবস্থাকে স্থিতিশীল করার প্রস্তাব যতই যুক্তিসংগত হোক, বাস্তবায়নের পথে বড় বাধা রয়েছে। রাষ্ট্রগুলো সবসময় সমঝোতাকে নিজেদের স্বার্থের অনুকূল মনে করে না। কোনো রাষ্ট্র যদি সামরিক আধিপত্য, ভূখণ্ড সম্প্রসারণ কিংবা রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের লক্ষ্য গ্রহণ করে, তাহলে কেবল আলোচনার মাধ্যমে তার আচরণ পরিবর্তন করা কঠিন হতে পারে। আবার আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সিদ্ধান্ত গ্রহণে বড় শক্তিগুলোর প্রভাব অনেক সময় কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের পথে বাধা সৃষ্টি করে।
অর্থনৈতিক আন্তঃনির্ভরতাও নিজে থেকে শান্তি নিশ্চিত করে না। রাষ্ট্রগুলো কখনো কখনো অর্থনৈতিক ক্ষতি মেনে নিয়েও নিরাপত্তা বা রাজনৈতিক লক্ষ্য অর্জনের জন্য সংঘাতে জড়ায়। একইভাবে সামরিক সক্ষমতা বাড়ানো কোনো ক্ষেত্রে আগ্রাসন প্রতিরোধ করতে পারে, কিন্তু অতিরিক্ত সামরিক প্রতিযোগিতা নতুন নিরাপত্তা-উদ্বেগও তৈরি করতে পারে। তাই প্রতিটি নীতিকে সংশ্লিষ্ট অঞ্চলের রাজনৈতিক বাস্তবতা, হুমকির ধরন এবং সম্ভাব্য প্রতিক্রিয়া বিবেচনায় নিয়ে প্রয়োগ করতে হবে।
এ কারণেই প্রস্তাবিত সমন্বিত স্থিতিশীলতা কাঠামোকে কোনো সর্বজনীন বা নিশ্চিত সমাধান হিসেবে দেখা উচিত নয়। এর কার্যকারিতা যাচাই করতে হবে বাস্তব ঘটনা, তুলনামূলক গবেষণা এবং পরিমাপযোগ্য সূচকের ভিত্তিতে। সংঘাতের সংখ্যা, বেসামরিক হতাহতের প্রবণতা, কূটনৈতিক চুক্তি বাস্তবায়নের হার, জ্বালানি ও খাদ্যের মূল্য-অস্থিরতা, সরবরাহব্যবস্থার স্থিতিস্থাপকতা এবং বাস্তুচ্যুত মানুষের পরিস্থিতি- এসবের মাধ্যমে অগ্রগতি মূল্যায়ন করা যেতে পারে।
ড. সুলতান মাহমুদ রানা : অধ্যাপক, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়







