ড. সাহাদৎ হোসেন আমেরিকার আর্লিংটনের টেক্সাস বিশ্ববিদ্যালয়ের সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের অধ্যাপক। মুন্সীগঞ্জের লৌহজং থানায় সুরদিয়া গ্রামে জন্ম শাহাদত হোসেনর। নারায়ণগঞ্জ হাইস্কুল ও ঢাকা কলেজে পড়াশোনা করে তিনি ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অফ টেকনোলজি, বোম্বে (আইআইটি,বোম্বে) থেকে সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে ব্যাচেলর ডিগ্রী নেন। এরপর থাইল্যান্ডের এশিয়ান ইনস্টিটিউট অফ টেকনোলজি(এআইটি), ব্যাংকক থেকে মাষ্টার্স শেষ করেন। এরপর তিনি ইউএস’এর নর্থ ক্যারোলিনা স্টেট ইউনিভার্সিটি থেকে ডক্টরেট ডিগ্রী লাভ করেন।
ড. হোসেনের ২৫ বছরেরও বেশি পেশাগত ও গবেষণালব্ধ অভিজ্ঞতায় টেকসই বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, ল্যান্ডফিল, ল্যান্ডফিল গ্যাস থেকে শক্তি, ল্যান্ডফিল মাইনিং, পুনর্ব্যবহারযোগ্য উপাদানের পুনর্ব্যবহার নিয়ে কাজ করেছেন। তার গবেষণা উন্নয়নশীল দেশগুলিতে টেকসই বর্জ্য ব্যবস্থাপনার জন্য উদ্ভাবনী সমাধানে অগ্রনী ভুমিকা রেখেছে। তিনি এইসব বিষয়ে ৪ টি বই ও ২০০টি জার্নাল প্রকাশিত হয়েছে।
তিনি সলিড ওয়েস্ট ইনস্টিটিউট ফর সাসটেনেবিলিটি (এসডাব্লিওআইএস) এর পরিচালক। গত বছর আজারবাইজানের বাকুতে কপ২৯ সম্মেলনে এই প্রতিবেদকের মুখোমুখি হয়েছিলেন তিনি। সাক্ষাতকার নিয়েছেন শাফিউল আল ইমরান।
শাফিউল আল ইমরান : একজন বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত শিক্ষাবিদ হিসেবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে থেকে বর্জ্য-ব্যবস্থাপনা নিয়ে কাজ করার অনুপ্রেরণা কোথা থেকে এল?
ড. শাহাদৎ হোসেন: আমি ছোটবেলায় নারায়ণগঞ্জে বড় হই এবং ঢাকা থেকে নারায়ণগঞ্জ যাতায়াতের সময় দেখতাম অনেক খোলা ময়লা স্তুপ, সেই দেখে বড় হওয়া। তখন আমার অনেক বন্ধু ছিল, যারা ময়লা স্তুপের আশেপাশে থাকতো-তারা অনেক বেশি অসুস্থ থাকতো। আমার কাছে ওই বিষয়টা সব সময় ভাবাতো তাই ভারতের আইআইটি বোম্বেতে পরাশুনা করার সময় – ময়লা/বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিয়ে থিসিস করার সময় বিষয়টি পরিস্কার হলো ‘ময়লার মানুষের কি সমস্যা’ তৈরি করে। তখন থেকেই ইচ্ছা – ময়লার উপরে কাজ করে বাংলাদেশেরমত অন্যান্য দেশের এই সমস্যা সমাধানের জন্য কিভাবে নিয়োজিত করা যায়। এরপরে আমি আমেরিকার নর্থ ক্যারোলিনা স্টেট ইউনিভাসির্টি (North Carolina State University, Raleigh) বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ’র উপর থেকে পিএইচডি করি ।
শাফিউল আল ইমরান: বাংলাদেশ এবং যুক্তরাষ্ট্র, এই দুই ভিন্ন দেশের প্রেক্ষাপটে আপনার অভিজ্ঞতাগুলো কীভাবে বিকশিত হয়েছে?
ড. শাহাদৎ হোসেন: আমেরিকারমতো বিশ্বের ধনী দেশগুলো বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় অনেক এগিযে। আমেরিকার মতো দেশের অনেক সল্যুশন তৈরি হলেও বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে ওই সল্যুশন কাজ করতেও পারে আবার নাও করতে পারে। সেই জন্য আমি রিসার্চ করার সময় উন্নয়নশীল দেশ দৃষ্টিভঙ্গি(Developing Country perspective) নিয়ে চিন্তা করেছি। পাশাপাশি ওইসব দেশের অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও সামাজিক অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে সমাধানের চিন্তা করেছি। আমি সব সময় চিন্তা করি – আমরিকায় ময়লা ব্যবস্থাপনা বা সিভিল ইন্জিনিয়ারিংয়ের সর্বশেষ টেকনোলজির ব্যবহার হয় সেটা বাংলাদেশে কিংবা আফ্রিকান বা লেটিন আমেরিকান গরীব দেশগুলোতে কিভাবে ব্যবহার করে সর্বোত্তম ফল পাওয়া যায়।
শাফিউল আল ইমরান: গ্লোবাল মঞ্চে বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত বিশেষজ্ঞরা যেভাবে টেকসই উন্নয়ন আর বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় অবদান রাখছেন, তা আপনি কীভাবে দেখেন?
ড. শাহাদৎ হোসেন: এটা খুবই ভালো খবর যে বাংলাদেশী বংশোদ্ভূতরা পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে খুবই ভালো কাজ করছে এবং বিভিন্ন দেশকে উন্নয়নে সাহায্য করছে। তবে আমি মনেকরি তাদের সেই জ্ঞান বুদ্ধি দেশে ব্যবহার করে দেশের উন্নয়নে সাহায্য করার পরিবেশ এবং সুযোগ দুইটাই থাকা জরুরী।
শাফিউল আল ইমরান: মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে আপনার অভিজ্ঞতা থেকে এমন কী কী বর্জ্য ব্যবস্থাপনার পদ্ধতি বা নীতি রয়েছে যা বাংলাদেশ সহজেই প্রয়োগ করা যেতে পারে?
ড. শাহাদৎ হোসেন: মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের টেকসই বর্জ্য ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি(sustainable waste management system) বাংলাদেশে কাজে লাগানোর সুযোগ আছে।তারজন্য-
প্রথমত; সবার আগে পরিবেশ পরিচ্ছন্নতা এবং স্বাস্থের উপকারিতা নিয়ে সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি করা জরুরী। মানুষ যদি বর্জ্য ব্যবস্থাপনা উপকারিতা বুঝতে না পারে তাহলে কখনোই পরিবেশ উন্নয়নে তা কাজে লাগবেনা।
দ্বিতীয়ত; মানুষেরমধ্যে বর্জ্য ব্যবস্থাপনার বিষয়টিকে উৎসাহিত করতে ইনসেনটিভ দেওয়া। যাতে তরুণ প্রজন্মকে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বিষয়ে নানারকম ব্যবসা করে পরিবেশ পরিস্কার রাখতে পারে।
তৃতীয়ত; বর্জ্য ব্যবস্থাপনার বিষয়গুলো নিয়ে নীতি নির্ধারকদের সঠিক তথ্য দিয়ে জানানো।অনেক সময় ইউরোপীয়া /আমেরিকার টেকনোলজি আমাদের দেশে কাজ নাও করতে পারে। তাই জরুরী হলো- কোন কাজের শুরুতে ওই প্রযুক্তির কতটা কাজে দেবে তার জন্য ফিজিবিলিটি চেক করা।
চতুর্থত; রিসাইক্লিং এবং একই জিনিস কিভাবে পুনরায় ব্যবহার করা যায়: আমেরিকায় ব্যবহৃত টেকনোলজি সরাসরি দেশে ব্যবহার করা যাবে।
পঞ্চমত; দক্ষ কর্মী প্রশিক্ষন-ট্রেনিং এবং ওয়ার্কশপের মাধ্যমে মানব পুজি তৈরী করা জরুরী। দক্ষ কর্মী ছাড়া কোন টেকনোলজি বাস্তবায়ন করা প্রায় অসম্ভব।
শাফিউল আল ইমরান: কপ২৯ -এর মতো আন্তর্জাতিক ইভেন্টে বাংলাদেশ কীভাবে আরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে?
ড. শাহাদৎ হোসেন: বাংলাদেশ কপে যাওয়ার আগেই বিভিন্ন উন্নত দেশের সঙ্গে যোগাযোগ করে দেশের সমস্যা তুলে ধরতে পারে। দেশের বাইরে যেসব বাংলাদেশী বিশেষজ্ঞ আছে তাদের সহায়তা নিয়ে উন্নত দেশগুলোর নিকট উপস্থাপনা করতে পারে, ওইসব(উন্নতদেশ) দেশের সহায়তার জন্য লবিং করতে পারে। আমাদের ছোট দেশ কিন্ত সমস্যা অনেক বেশি সেজন্য সমস্যা মোকাবেলায় আলাদাভাবে উপস্থাপন কৌশল অবলম্বন করা জরুরী।
শাফিউল আল ইমরান: আপনার মতে, গত কয়েক বছরে বাংলাদেশ বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বা সার্কুলার অর্থনীতিতে কতটা উন্নতি করেছে?
ড. শাহাদৎ হোসেন : বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং সর্কুলার ইকোনমি একে অপরের সাথে জড়িত। বাংলাদেশে সার্কুলার ইকোনমি নিয়ে কথা হলেও কাজের তেমন উন্নতি এখনো হয়নি। তবে বর্তমান উপদেষ্টা রিজওয়ানা হাসানের কারণে আমি খুবই আশাবাদী, তার আমলে দেশে অনেক ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে। আমি কপ২৯ এ সরকারের পরিবেশ উপদেষ্টা রিজওয়ানা হাসান ও পরিবেশ সচিব ড. ফারহানা আহমেদের সাথে কথা বলে-আশার আলো দেখতে পেয়েছি। দুইজনেই খুবই জ্ঞানী এবং উৎসাহী বাংলাদেশের পরিবেশের উন্নয়ন করার জন্য। তাদের উপস্থাপনা,পরিবেশ বিষযে জ্ঞান এবং ইন্টারনেশনাল ইভেন্টে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করার প্রতিভা দেখে আমি সত্যিই মুগ্ধ।
শাফিউল আল ইমরান: বাংলাদেশী বংশোদ্ভূত বিদেশি বিশেষজ্ঞদের নিকট কী সরকার সাহায্য চাইতে পারেন।
ড. শাহাদৎ হোসেন : পলিসি মেকার / রাজনীতিবিদদের সাহায্য খুবই জরুরি। তাদের সঠিক জ্ঞান প্রদানের জন্য দেশের বিশেষজ্ঞদের সাথে বাংলাদেশী বংশোদ্ভূত বিদেশী বিশেষজ্ঞদের সাহায্য নেয়া জরুরী । কারণ তারাই বাংলাদেশের জন্য দরকারী নতুন টেকনোলজি (যা উন্নত দেশে ব্যবহার হচ্ছে) বিষয়ে ধারণা দিতে পারবেন।
শাফিউল আল ইমরান:: কপ ২৯ এর আলোচনায় বাংলাদেশসহ উন্নয়নশীল দেশের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা চ্যালেঞ্জগুলো কীভাবে উঠে এসেছে বলে আপনি মনে করেন?
ড. শাহাদৎ হোসেন : বাংলাদেশে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কাজ করছে না: আমাদের সাসটেনেবল ওয়েষ্ট ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম না থাকায়: ময়লা থেকে গ্রীন হাউজ গ্যাস, মিথেন এবং কার্বন-ডাই-অক্সাইড পরিবেশে যাচ্ছে। কার্বন ফুটপ্রিন্ট কমানোর জন্য এই দুই গ্যাস সংগ্রহ ও ব্যবস্থাপনা জরুরী। আমাদের বর্জ্য সংগ্রহ বাড়ানো ও খোলা ডাম্পসাইট কমানো জরুরী। বাংলাদেশ বিজ্ঞানসম্মত কোন ল্যান্ডফিল নেই এবং দেশের বিভিন্ন জায়গায় স্থায়ী ল্যান্ডফিল নকশা করা জরুরী যাতে ওই ল্যান্ডফিলগুলো শত বছর ব্যাবহার করা যায়।
শাফিউল আল ইমরান: বাংলাদেশের জন্য কপের মত ইভেন্ট থেকে কী কী ফলাফল সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হবে বলে মনে করেন?
ড. শাহাদৎ হোসেন : বাংলাদেশের জন্য পর্যাপ্ত পরিমাণ ক্লাইমেট ফাইন্যান্স পাওয়া জরুরি। পাশাপাশি উন্নত দেশগুলোর বুঝতে পারা উচিত যে বাংলাদেশের সমস্যা ইউনিক এবং এর ইমিডিয়েট সমাধান দরকার। সেই সাথে উন্নত দেশগুলোর আরো বোঝা দরকার বাংলাদেশ সরকার পরিবেশের জন্য গুরুত্ব সহকারে কাজ করছে।
শাফিউল আল ইমরান: দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় একে অপরের সঙ্গে কীভাবে সহযোগিতা করতে পারে? আপনার অভিজ্ঞতায় এর কোন দিকগুলো সবচেয়ে কার্যকর হবে?
ড. শাহাদৎ হোসেন : দক্ষিণ এশিয়ার বেশীরভাগ দেশেই ময়লা ব্যবস্থাপনা মানেই খোলা ডাম্পসাইট (open dumpsite), যা পরিবেশের এবং মানুষের স্বাস্থের জন্য ক্ষতিকর। সার্ক (SAARC) এর মতো প্লাটফর্মে ময়লা ব্যবস্থাপনা নিয়ে আলোচনা জরুরী। সবাই মিলে কিভাবে ময়লা ব্যবস্থাপনা সঠিক ভাবে করা যায়, তার জন্য মিটিং এবং ওয়ারকশপ করা জরুরী।
শাফিউল আল ইমরান: যদি আপনি বাংলাদেশের সরকারকে পরামর্শ দিতে পারতেন, তাহলে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা উন্নত করতে কী তিনটি প্রধান উদ্যোগের কথা বলতেন?
ড. শাহাদৎ হোসেন : সামাজিক সচেতনতা তৈরি করা ( টিভি, পত্রিকা ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রচারণা) । – ময়লা ব্যবস্থাপনায় উৎসাহিত করা এবং তরুণ ব্যবসায়ীদের জড়িত করা। তাদের নতুন / উপযোগী টেকনোলজি বাস্তবায়ন করতে নীতি নির্ধারকরা যেন সাহায্য করে।
শাফিউল আল ইমরান: আপনার মতো প্রবাসী বিশেষজ্ঞরা কীভাবে বাংলাদেশের নীতিতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারেন?
ড. শাহাদৎ হোসেন : এদেশের আমরা যারা পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে বর্জ্য ব্যবস্থাপনার বিষয়ে বিশেষজ্ঞ হিসেবে সঠিক ব্যবস্থাপনা নির্ধারণ করতে সহায়তা করি তারা কয়েকটি বিষয়ে সাহায্য করতে পারি। যেমন: (১) নতুন টেকনোলজির ব্যাবহার। (২) উন্নত দেশগুলো কিভাবে বর্জ্য ব্যবস্থাপনার সঠিক ব্যবহার করছে তা উন্নয়নশীল দেশগুলোতে সেই অভিজ্ঞতা শেয়ার করা। সেই লব্ধ জ্ঞান থেকে কিভাবে সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি করা। (৩) কিভাবে ময়লা ল্যান্ডফিল্ডে না ফেলে অন্য কাজে ময়লা ব্যবহারের কৌশল জানানো। সেই ময়লাকে সমস্যা না ভেবে কিভাবে সম্পদ হিসেবে ব্যবহার করা যায় । (৫) শহর কিভাবে পরিস্কার পরিচ্ছন্ন করা যায় (৬) নতুন কর্ম সংস্থানের ব্যবস্থা করা-ময়লা ব্যবস্থাপনায় হাজার হাজার মানুষের কর্মসংস্থান করা সম্ভব। (৭) দেশে পরিবেশ সম্মতভাবে রিসাইক্লিংয়ের মধ্যেমে পুনরায় ব্যবহার বাড়ানো যায় সেক্ষেত্রে কাজ করা। (৮) মশার সমস্যার সমাধান এবং ডেংগুরোগের প্রতিরোধে সহায়তা করা (৯) স্বাস্থকর এবং পরিস্কার শহর / গ্রাম তৈরীতে বাংলাদেশের জন্য রোডম্যাপ তৈরী এবং বাস্তবায়ন করা।
শাফিউল আল ইমরান: বাংলাদেশ ও মার্কিন প্রতিষ্ঠানের মধ্যে কোন প্রযুক্তি বা গবেষণার ক্ষেত্রে সহযোগিতা করার সম্ভাবনা আছে?
ড. শাহাদৎ হোসেন : হাঁ, সম্ভাবনা আছে। কিন্তু এক্ষেত্রে সরকারের ভুমিকা পালন করা জরুরী। পরিবেশ মন্ত্রণালয় এই বিষয়ে ভুমিকা রাখতে পারে। পরিবেশ উপদেষ্টা রিজওয়ানা হাসান এবং পরিবেশ সচিব ড. ফারহিনা এই বিষয়ে উৎসাহী এবং আমাকে অনুপ্রাণিত করেছেন।
শাফিউল আল ইমরান: বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয় এবং গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলো কীভাবে এই সেক্টরে উন্নতি আনতে পারে?
ড. শাহাদৎ হোসেন : শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং বেসরকারী খাতের সাথে কৌশলগত অংশীদারিত্ব। শিক্ষার্থীদের মধ্যে পরিবেশ সচেতনতা বৃদ্ধি করে তাদের পাঠ্যক্রমের অংশ হিসাবে বর্জ্য ব্যবস্থাপনাকে অন্তর্ভুক্ত করার জন্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সাথে সহযোগিতা স্থাপন করা। একই সাথে, কাজরে সুযোগ এবং দক্ষতা অর্জনের জন্য সরকারী-বেসরকারি অংশীদারিত্ব বিকাশ করা। উদ্ভাবনী প্রশিক্ষণ দেওয়া গেলে উভয় পক্ষই উপকৃত হবে ও সমাধান তৈরি করা যাবে ।
– বাংলাদেশে বর্জ্য নিয়ে কাজ করার ক্ষেত্রে বিশেষজ্ঞদের মধ্যে বুয়েটের ভিসি ড. বদরুদ্দোজামান অন্যতম। ইতিমধ্যে প্রফেসর বদরুজ্জামানের সঙ্গে ময়লা ব্যবস্থাপনার জন্য কোলাবোরেশন নিয়ে কথা হয়েছে। এসব কাজ করতে বিদেশের প্রতিষ্ঠানের সাথে সহযোগিতা ও পার্টনারশিপ দরকার। সেইসাথে বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয় এবং সংস্থার সঙ্গে যোগাযোগ এবং পার্টনারশিপ করা জরুরী। এছাড়াও বর্জ ব্যবস্থাপনার জন্য প্রধান সমিতি: আর্ন্তজাতিক সলিড ওয়েষ্ট এসোসিয়েশন(আইএসডাব্লিওএ)এর সাথে যুক্ত হয়ে কাজ করা দরকার। আমি আইএসডাব্লিওএ এর সাথে গত ১২ বছর যাবত কাজ করছি। প্রতিষ্ঠানটির(আইএসডাব্লিওএ) নতুন প্রেসিডেন্ট জেমস লু (James Law) আমার বন্ধু। আমি এ বিষয়ে বাংলাদেশকে সাহায্য করতে পারি।
শাফিউল আল ইমরান:বাংলাদেশের শিক্ষার্থীরা কীভাবে গ্লোবাল একাডেমিক নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত হয়ে দেশের জন্য নতুন সমাধান আনতে পারে?
ড. শাহাদৎ হোসেন: বর্জ ব্যবস্থাপনার জন্য প্রধান সমিতি আইএসডাব্লিওএ এর সাথে বাংলাদেশের শিক্ষার্থীরা কীভাবে গ্লোবালি কাজ করার জন্য যুক্ত হতে পারে। আইএসডাব্লিওএ এর সঙ্গে যুক্ত থেকে তারা ইয়ং প্রফেশনাল গ্রুপ(ওয়াইপিজি) (Young Professional Group- YPG) এ তে শিশিক্ষার্থীরা যোগ দিতে পারে। আমি বিনা দ্বিধায় বলতে পারি; সেখানে কাজ করতে বাংলাদেশের উপদেষ্টা রিজওয়ানা হাসান সর্বাত্বক সাহায্য করবেন।
শাফিউল আল ইমরান: বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বাংলাদেশের জলবায়ু কর্মসূচির সঙ্গে কীভাবে আরও ভালোভাবে একীভূত হতে পারে?
ড. শাহাদৎ হোসেন : সঠিক ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে কার্বন ফুটপ্রিন্ট কমানো সম্ভব। প্লাষ্টিক রিসাইকেল এবং প্লাষ্টিক রিইউজ করে ক্লিনেট এডাপটিভ ম্যাটেরিয়ালস (Climate Adaptive Materials) তৈরী করা সম্ভব যা সার্কুলার ইকোনমি প্রসারে সহায়তা করতে পারে।
শাফিউল আল ইমরান: বাংলাদেশের অপ্রাতিষ্ঠানিক শ্রমিকরা বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তাদের সিস্টেমের সঙ্গে আরও কার্যকরভাবে যুক্ত করার উপায় কী?
ড. শাহাদৎ হোসেন: বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় মধ্যস্থতাকারীদের প্রভাব কমিয়ে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা। বিশেষ করে রাজনৈতিক সম্পর্কযুক্ত ব্যক্তিদের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কার্যক্রম থেকে দূরে রাখা।
– বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কার্যক্রম নিরীক্ষণ ও তদারকি করার জন্য স্থানীয় বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কমিটি গঠন করা, ক্ষমতার কেন্দ্রীভূততা এবং দুর্নীতির সম্ভাবনা হ্রাস করা।
– অনানুষ্ঠানিক বর্জ্য সংগ্রহকারী এবং ব্যবসার নিবন্ধনের জন্য একটি কাঠামো তৈরি করা, তাদের আইনীভাবে পরিচালনা করতে বিষয়টি নিয়ন্ত্রক ও তদারকি করে তাদের লাভবান হতে সক্ষম করে তোলা।
– রোস্টার বা শিফট সিস্টেমে কাজ করা কর্মীদের তাদের লাইফস্টাইলের সাথে পছন্দসই সময় অনুযায়ী কাজ করার সুযোগ দেওযা।
– বর্জ্য ব্যবস্থাপনার সাথে নিয়োজিত বর্জ্য কর্মীদের জন্য প্রণোদনা দেওয়া উচিত (যেমন; সপ্তাহে একদিন বিনামূল্যে স্বাস্থ্যসেবা দেওয়া)।
– কর্মীদের কাজের জন্য ন্যূনতম চাকুরীর নিশ্চিয়তা নিশ্চিত করা। এছাড়া অতীতের কর্মক্ষমতার উপর ভিত্তি করে ন্যূনতম বেতন এবং অতিরিক্ত প্রচেষ্টার জন্য নিয়মিত বোনাস নিশ্চিত করা।
– নমনীয় শিক্ষা ব্যবস্থা: সকাল, বিকাল এবং সন্ধ্যার স্কুলগুলিতে বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় নিয়োজিত শ্রমিকদের জন্য নমনীয় শিক্ষা ব্যবস্থা নিশ্চিত করা।
শাফিউল আল ইমরান: বাংলাদেশি হিসেবে কোন বিষয়গুলো আপনাকে বাংলাদেশের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা প্রচেষ্টার জন্য সবচেয়ে গর্বিত করে তোলে?
ড. শাহাদৎ হোসেন: সঠিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে: – শহর ও গ্রাম পরিস্কার পরিচ্ছন্ন করা, সবার জন্য স্বাস্থ্য সেবা নিশ্চিত করা ও গরীব মানুষের জন্য কম মূল্যে হাসপাতালে চিকিৎসা সেবা দেওয়ার ব্যবস্থা করা। বাংলাদেশের বাতাসের মান নিশ্চিত করা। মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করা। এছাড়াও বাংলাদেশ উন্নত দেশের সাথে তুলনা করতে পারার ও বিদেশে থেকেও দেশকে সাহায্য করতে পারার বিষয়টা আমাকে গর্বিত করে তোলে।
শাফিউল আল ইমরান: যারা এই সেক্টরে কাজ করতে চায়, তাদের জন্য আপনার পরামর্শ কী?
ড. শাহাদৎ হোসেন: ব্যাপক প্রশিক্ষণের উদ্যোগ: বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় নিয়োজিত সকল স্তরের কর্মীদের জন্য নিয়মিত কাঠামোগত প্রশিক্ষণ কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা। এই প্রোগ্রামগুলির মধ্যে সর্বোত্তম অনুশীলন, উদীয়মান প্রযুক্তি এবং পরিবেশগত বিধিগুলির সাথে সম্মতি অন্তর্ভুক্ত করা উচিত। এন্ট্রি-লেভেল থেকে ম্যানেজারিয়াল পজিশন পর্যন্ত কার্যকর এবং দক্ষ বর্জ্য ব্যবস্থাপনা অনুশীলন নিশ্চিত করতে পারলে কর্মীদের দক্ষতা ও জ্ঞান বৃদ্ধি পাবে।
– সম্প্রদায়ের সম্পৃক্ততা এবং শিক্ষা: স্থানীয় সম্প্রদায়কে টেকসই বর্জ্য অনুশীলনের বিষয়ে শিক্ষিত করার লক্ষ্যে কর্মশালার আয়োজন করা। সেখানে বর্জ্য পৃথকীকরণ, পুনর্ব্যবহারের কৌশল এবং অনুপযুক্ত বর্জ্য ব্যবস্থাপনার পরিবেশগত প্রভাবগুলিকে নিয়ে আলোচনা ও জ্ঞান দেওয়া। এরফলে জনসাধারণের অংশগ্রহণ এবং সচেতনতা বৃদ্ধির মাধ্যমে, সম্প্রদায় সক্রিয়ভাবে আরও কার্যকর বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় অবদান রাখতে পারবে।
শাফিউল আল ইমরান: আপনার মুল্যবান সময় দেওয়ার জন্য ধন্যবাদ।
ড. শাহাদৎ হোসেন: আপনাকে ও আমার দেশের সকল মানুষকে ধন্যবাদ।









