পটুয়াখালীর রাঙ্গাবালী উপজেলা দক্ষিণাঞ্চলে তরমুজ উৎপাদনে ‘রাাজধানী’ হিসেবে পরিচিত। এখানকার তরমুজের গুণগতমান ভালো হওয়ায় দেশজুড়ে সুনাম কুড়িয়েছে। চাহিদার পাশাপাশি লাভজনক ফল হওয়ায় নতুন নতুন চাষিও বাড়ছে। বিশেষ করে গত বছর তরমুজের ফলন ও দাম ভালো হওয়ায় এবার কৃষকেরা আরো তরমুজ চাষের প্রস্ততি নিচ্ছেন। এজন্য তারা আগাম ধান লাগিয়েছেণ যাতে আগাম তরমুজ চাষ করতে পারে।
সাধারণত ডিসেম্বরে আমন ধান তোলার পর জানুয়ারি থেকে তরমুজের আবাদ শুরু হয়। ফলন আসে এপ্রিলে। তবে রাঙ্গাবালী উপজেলায় ডিসেম্বরেই আগাম তরমুজের আবাদ শুরু হয়। ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি থেকে শুরু হয় তরমুজ বিক্রি।
কৃষি বিভাগের তথ্যমতে, গত মৌসুমে রাঙ্গাবালীর চরমোন্তাজ, কাউখালীর চর, কলাগাছিয়ার চর, চর ইমার সোন, ছোটবাইশদিয়া, মৌডুবীর জাহাজমারার বালুর চরসহ ৮ হাজার ২৫০ হেক্টর জমিতে তরমুজ আবাদ করা হয়। যা তার আগের মৌসুমের ৬ হাজার ৩৫০ হেক্টরের চেয়ে বেশি।
উপজেলার চরমোন্তাজ এলাকার তরমুজ চাষি শহিদুল ইসলাম জানায়, গত বছর আগাম তরমুজ দিয়ে তিনি লাভবান হওয়ায় এ বছরও তিনি আগাম তরমুজ চাষের প্রস্তুতি হিসেবে আগাম জাতের ধান লাগিয়েছেন ।
তিনি আশা করছেন সবকিছু ঠিক থাকলে এ বছর ২০ একরেরও বেশি জমিতে তরমুজ চাষ করবেন।
রাঙ্গাবালী উপজেলায় মো. নেছার উদ্দিন (৪৬)। চার সন্তানের জনক নেছার উদ্দিনের সংসারে খুব বেশি স্বচ্ছলতা ছিল না। কিন্ত এবার তরমুজ চাষ করে তিনি সংসারে স্বচ্ছলতা এনেছেন। ছোটবাইশদিয়া ইউনিয়নের চতলাখালী গ্রামের নেছার উদ্দিনের সঙ্গে টেলিফোনে কথা হয় এ প্রতিবেদকের। তিনি বলেন, ‘এই প্রদর্শনী থেকে ১০ কড়া (৩৩ শতক) জমিতে তরমুজ চাষ করেছি। ২ লাখ ১৫ হাজার ট্যাহা (টাকা) বেচচি। আমার খরচ গেছে এম্মে হাজারের মতো গেছে। আল্লায় দিছে অনেক ট্যাহা লাভ হইছে। এটা হলো ৪ মাসের ফসল। কৃষি অফিস থেকে ১০ পদের সার ও ঔষুধ দিছে। সব ঔষুদের নাম তো কইতে পারি না, ১০ পদের দিছে।’
তিনি এবার আরো বেশি জমিতে তরমুজ করার আশায় আগাম জাতের ধান লাগিয়েছেন। এ বিষয়ে কৃষি বিভাগ যেমন সহযোগীতা করেছেন সেটাও তিনি কৃতজ্ঞ চিত্তে মনে করেন।
শুধু শহিদুল ইসলাম, নেছার উদ্দিনই নয়, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় সারাদেশের চর এলাকাগুলোতে আধুনিক কৃষি প্রযুক্তি ব্যবহার করে ফসলের আবাদ বাড়ানোর প্রকল্পের আওতায় তরমুজ চাষ করে সবাই লাভবান হয়েছেন। যে জায়গাগুলোতে আগে কোনো চাষ হতো সেখানকার বিস্তৃত চরে তরমুজ চাষ করার প্রস্তুতি নিয়ে আছেন।
চাষিরা জানায়, প্রতি বছরের ন্যায় আগামী মৌসুমেও সৈকতের পুরো বালুচর ও চরে আগাম তরমুজ চাষ করবেন। গত বছরের মতো আবহাওয়া ভালো থাকলে আগাম তরমুজ বিক্রি করে লাভবান হবেন এই আশা তাদের। তরমুজ চাষি ইমন হাওলাদার বলেন, গতবছর আড়াই কানি জমিতে তরমুজ চাষ করে ভালো লাভ হয়েছে, এবারও ইনশাল্লাহ ভালো লাভ করতে পারবো। আর কৃষি বিভাগের চর প্রকল্প থেকে সহযোগীতায় তারা লাভবান হয়েছেন।
‘বাংলাদেশের চর এলাকায় আধুনিক কৃষি প্রযুক্তি সম্প্রসারণ’ শীর্ষক প্রকল্প থেকে দেশের চরাঞ্চলের জমিতে খরা-সহনশীল ও স্বল্প জীবনকালীন ফসলের জাত, উপযুক্ত কৃষি প্রযুক্তি সম্প্রসারণ করা হচ্ছে। এর ফলে শস্য বৈচিত্র্য ও কৃষি বাণিজ্যিকীকরণ বৃদ্ধি, খাদ্য নিরাপত্তা ও জাতীয় পুষ্টির চাহিদা পূরণ এবং আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে কাজ করে চলছে। যার উদহারণ এই রাঙ্গাবালীর কৃষকরা।
কৃষি মন্ত্রণালয়ের ‘বাংলাদেশের চর এলাকায় আধুনিক কৃষি প্রযুক্তি সম্প্রসারণ’ শীর্ষক প্রকল্প থেকে জানা যায়, সরকারের সম্পূূর্ণ নিজস্ব অর্থায়নে ২০৯ কোটি ২১ লাখ টাকা ব্যয়ে দেশের সাতটি বিভাগের ৩৫টি জেলার ১২১টি উপজেলায় বাস্তবায়ন করা হবে এই প্রকল্প। কৃষি মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে নেয়া প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর (ডিএই)।
প্রকল্পের আওতায় কৃষকের দক্ষতা উন্নয়ন প্রশিক্ষণ দেয়া হয়। বিভিন্ন সময় মাঠ দিবস ও সেমিনার বা ওয়ার্কশপের আয়োজন করে কৃষকদের সঠিক সময়ে সঠিক ফসল লাগানোর পরামর্শ দেওয়া হয়।
এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে প্রকল্প পরিচালক(পিডি) মো. জিয়াউর রহমান বলেন, ‘প্রকল্পের মাধ্যমে দেশের পতিত জমি ব্যবহারের মাধ্যমে চর অঞ্চলের শস্যের নিবিড়তা ১৪০ শতাংশ থেকে ১৪৫ শতাংশে উন্নীত হবে। এর ফলে শস্য বৈচিত্র্য ও কৃষি বাণিজ্যিকীকরণ বৃদ্ধি, খাদ্য নিরাপত্তা ও জাতীয় পুষ্টির চাহিদা পূরণ এবং আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে।’
আশা করছি, প্রকল্পটির মাধ্যমে কৃষকরা যেমন উপকৃত হচ্ছেন তেমনি দেশের চরাঞ্চলের জমিতে খরা সহনশীল ও স্বল্প জীবনকালীন ফসলের জাত, উপযুক্ত কৃষি প্রযুক্তি সম্প্রসারণ করা হবে।






