যেন এক নিপুণ শিল্পকর্ম। উঁচু-নিচু টিলার ভাঁজে ভাঁজে সারি সারি আনারস, কমলা, মাল্টা ও লেবুগাছ। আছে কাজুবাদাম আর কফিগাছও। সিলেটের গোলাপগঞ্জ উপজেলার লক্ষণাবন্দ ইউনিয়নে গড়ে উঠেছে এই কৃষি খামার, নাম ‘ আলভীনা গার্ডেন’।
চালুর অল্প কিছুদিনের মধ্যে বিশাল এক পর্যটন কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে এটি। প্রতিদিনই দূর-দূরান্ত থেকে শত শত ভ্রমণপিপাসু ছুটে আসছেন এখানে। টিকিট কেটে ঢুকছেন এর ফলবাগানে। ঘুরে দেখছেন।
এখানে পাহাড়ের ওপর বসার ব্যবস্থা করা হয়েছে পর্যটকদের জন্য। সেখানে বসে টাটকা ফল ও ফলের জুস উপভোগ করতে পারেন তারা। অনেকেই সেগুলো কিনে বাড়িতেও নিয়ে যাচ্ছেন।
পর্যটকের নির্বিঘ্ন চলাচলে প্রয়োজনীয় নিরাপত্তার ব্যবস্থাও নেওয়া হয়েছে গার্ডেনটিতে। তাই, সবুজের সমাহার যেমন আনন্দ দিচ্ছে, তেমনি নিরাপত্তা নিয়ে বিন্দুমাত্র চিন্তা নেই তাদের।
আলভীনা গার্ডেনের বিষয়ে জানতে চাইলে কৃষি সচিব ওয়াহিদা আক্তার সংবাদকে বলেন ‘ আলভীনা গার্ডেনে বেসরকারি বিনিয়োগ আছে। সেখানে যে কৃষি পর্যটনের ব্যবস্থা করা হয়েছে, সেটা অবশ্যই প্রশংসনীয়। দেখলাম সেখানে প্রচুর মানুষ যাচ্ছে, ছবি তুলছে। সব-সময় যেন একটা মেলার মতো অবস্থা সেখানে। মানুষজন একদিকে যেমন ভ্রমণ করছে, তেমনি কৃষির ব্যাপারে উদ্বুদ্ধ হচ্ছে।’
কৃষি পর্যটনের অবকাশযাপনের একটি ধরন। এর আওতায় খামারগুলোতে আতিথেয়তার আয়োজন করা হয়। কৃষি পর্যটনে সারা বিশ্বে সবচেয়ে এগিয়ে আছে আমেরিকা ও ফিলিপিন। তবে, নিউজিল্যান্ড, ইন্দোনেশিয়া, পর্তুগাল, ইংল্যান্ড জ্যামাইকা, উগান্ডা, আয়ারল্যান্ড, আফ্রিকা, অস্ট্রেলিয়া ইত্যাদি দেশগুলোও আগে থেকেই জনপ্রিয়। সময়ের প্রেক্ষিতে বাংলাদেশেও এর প্রচলন শুরু হলো।
শুরুর গল্প:
ইংল্যান্ডের ইষ্ট লন্ডনে থাকার সুবাদে কৃষি পর্যটনব বা অ্যাগ্রো ট্যুরিজমের সঙ্গে পরিচয় ঘটে আলভীনা গার্ডেনের ব্যাবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) আব্দুর রব রুবেলের। বিভিন্ন বিষয় দেখে এ বিষয়ে আগ্রহ তৈরির ফলেই দেশে এমন একটি বাগান করার কথা চিন্তা করেন তিনি।
তিনি বলেন, ‘ওখানে বড় বড় ফার্মগুলোতে ফ্যামিলি প্যাকেজ বলে একটা সিস্টেম আছে। সেখানে ট্যুরিষ্টরা যাবে, খাওয়া-দাওয়া থেকে শুরু করে ঘোরাঘুরি-সব করবে। পরে ওই প্যাকেজ অনুযায়ী তা পে(পরিশোধ) করবে। বিষয়টি আমার দারুণ লেগে যায়। সেখান থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে বাংলাদেশে এমন একটা কিছু করার চিন্তা মাথায় আসে।’
লন্ডন থেকে দেশে ফিরে কৃষি অফিসের সাথে পরামর্শ করেন তিনি। তারা প্রথমে লেবু ও আনারস দিয়ে শুরু করতে বলেন। সেই থেকে শুরু।
এখন তার বাগানে কফি, মালটা, কমলা ও আনারসের বিপুল সমাহার। রুবেলের স্বপ্ন, আগামী বছর থেকে পর্যটকরা তার বাগানে উৎপাদিত কফিতে আয়েশ করে চুমুক দিতে পারবেন।
তিনি জানান, প্রথমে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মাধ্যমে পরীক্ষা করানো হয়। তারা জানায়, পাহাড়ী টিলার মাটি কফি চাষের জন্য খুব উপযোগী। তাই ১৫ ’শ কফি গাছ লাগিয়েছি। গাছ থেকে এখনো ফল দেয় নাই। আশা করছি সামনের সিজনে দেবে।
আলভীনা গার্ডেন:
সিলেট জেলার গোলাপগঞ্জ উপজেলার লক্ষনাবন্দ ইউনিয়নের পাহাড়লাইন রোডের নিজ ঢাকা দক্ষিণে আলভীনা গার্ডেনের অবস্থান। ২০২১ সালের জুন মাসে ১৭ একর জমিতে বাগান তৈরির কার্যক্রম শুরু হয় বলে জানান আব্দুর রব। তিনি বলেন, ‘১০ বছরের জন্য ১৭ একর জায়গাটি লিজ নেওয়া হয়েছে। আগামীতে এই লিজের সময় আরো বাড়বে।’
তিনি আরো বলেন, ‘জায়গাটি প্রথমে ঘন জঙ্গলে ঠাসা একটি পতিত টিলা ছিল। এটি পরিস্কার করতেও সময় লাগছে প্রায় ছয় মাসের মতো। প্রথমে প্রায় সাড়ে চারশ লেবু গাছ আর ১০ হাজারের মতো আনারসের চারা দিয়ে শুরু করলাম। গত মৌসুমে আনারসের ফল এসেছে ১০ থেকে ১৫ হাজার। এখন সর্বমোট আনারশ গাছের সংখ্যা এক লক্ষ ত্রিশ হাজার।’
রুবেল বলেন, ‘আমার জন্ম ও বেড়ে ওঠা গ্রামেই। সব সময় দেখে এসেছি কৃষিই আমাদের মূল পেশা। কৃষির প্রতি আমার একটা আলাদা টান ছিল। বিশেষ করে এই প্লেসটা আমার বাড়ির কাছে হওয়ায় আরো ভালো হয়।’
কী বলছে কৃষি বিভাগ:
সিলেট কৃষি অফিস সূত্রে জানা যায়, টিলা এলাকায় চাষবাসে বেশকিছু বিষয় বিবেচনা করতে হয়। প্রথমত টিলার মাটি শুষ্ক এবং বর্ষাকাল শেষে শুকিয়ে যায়। তাই গাছ লাগানোর ক্ষেত্রে দীর্ঘ মূলবিশিষ্ট গাছ লাগাতে হয়। দ্বিতীয়ত, টিলার ঢালুতে ফসলের যত্ন নেয়া এবং বারবার যাওয়া-আসা কঠিন। তাই এমন গাছ লাগানো উচিত যাতে একবার লাগালে ন্যূনতম ১০-১৫ বছর ফলন পাওয়া যায়।
দীর্ঘ মূলবিশিষ্ট গাছ হলে টিলার মাটিও ধরে রাখে। সেই দিক থেকে কদম রসুল এলাকা কফি চাষের জন্য সম্ভাবনাময় জায়গা।
কাজুবাদাম ও কফি গবেষণা উন্নয়ন ও সম্প্রসারণ প্রকল্পের পরিচালক (পিডি) শহীদুল ইসলাম বলেন, ‘আমাদের দেশেও এগুলোর বাজার বাড়ছে। দেশের পাহাড়ি এলাকায় কাজুবাদাম ও কফি চাযের ব্যাপক সম্ভাবনাকে কাজে লাগানোর লক্ষ্য মন্ত্রণালয়ের দিকনির্দেশনায় প্রকল্পের কার্যক্রম চলমান রয়েছে।’
সমতলের চেয়ে পাহাড়ি অঞ্চলে আরো ব্যাপক আকারে এর চাষ হচ্ছে বলেও জানান তিনি। তিনি বলেন, ‘সিলেট অঞ্চলে কাজুবাদাম ও কফি চাষ সম্প্রসারণের ব্যাপক সুযোগ রয়েছে। সিলেট অঞ্চলে প্রায় ৮০০ অনাবাদী টিলা রয়েছে। আমাদের প্রকল্পের মাধ্যমে এ সকল টিলায় কাজুবাদাম ও কফি চাষ সম্প্রসারণের কাজ শুরু করেছি। এ লক্ষ্যে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর যথাযথ পদক্ষেপ গহণ করেছে।’
তার মতে, দাম ও চাহিদা দুটোই বৃদ্ধি পাওয়ায় পাহাড়ি এলাকার চাষিদের মাঝে এ দুটি ফসল চাষে ব্যাপক আগ্রহের সৃষ্টি হয়েছে।
মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলেন, ‘এ অঞ্চলে কয়েক হাজার টিলা আছে, এখানকার অল্প কিছু টিলায় কফি, কাজুবাদাম, আনারস ও লেবু চাষ শুরু হয়েছে। যা খুব দৃষ্টিনন্দন কৃষির উদাহরণ। ইতিমধ্যে আমরা পতিত টিলাগুলোতে ষ কৃষির আওতায় আনতে মোটিভেশনাল সভা করেছি, যাতে তাদেরকে কৃষিতে আরো বেশি সম্পৃক্ত করা যায়।’
সুবিধা-অসুবিধা:
পাহাড়ী টিলায় কৃষি উৎপাদনের মূল সমস্যা সেচের পানি। পাহাড়ের পাদদেশে যারা ফলদ বাগান করে তাদের অনেক খরচ করে তেলচালিত মোটরের মাধ্যমে সেচ দিতে হয়। এতে তেলের খরচ অনেক বেশি পড়ে। কৃষি উদ্যোক্তাদের লাভ হয় কম। আবার তেলচালিত মোটর ব্যবহার করে বাগানে সেচের ব্যবস্থা করার সামর্থ্য অনেক কৃষকেরই থাকে না।
আগে শুধু পানির অভাবে সমতলের অনেক ধানি জমিও অনাবাদী হয়ে পড়ে থাকত। সেইসব চ্যালেঞ্জ সত্ত্বেও কিছু উদ্যোমী কৃষি উদ্যোগতা তাদের স্বপ্ন পূরণের চেষ্টা করছেন। এক্ষেত্রে কৃষি মন্ত্রণালয়ও এগিয়ে এসেছে। তবে, তা প্রয়োজনের ‘তুলনায় অল্প’।
ইতিমধ্যে মন্ত্রণালয়ের বরাদ্দে একটি স্প্রিংকলার বসানো হয়েছে। আব্দুর রব বলেন, ‘পানির জন্য যে ব্যবস্থা আছে তা পর্যান্ত নয়। তবে, মন্ত্রণালয় থেকে একটি স্প্রিংকলার দিয়েছে। এটা প্রয়োজনের তুলনায় এক চতুর্থংশও হবে না।’
তিনি আশা করেন, মন্ত্রণালয় আগামীতে এ বিষয়ে যথাযথ পদক্ষেপ নিবেন।






