বাবা-মা, বোন ও ছোট ভাইকে নিয়ে সাত দিনের থাইল্যান্ড সফর; ফুকেট, ফি ফি আইল্যান্ড, ক্রাবি ও ব্যাংককের বৈচিত্র্যময় সৌন্দর্যে পরিবারের একসঙ্গে সময় কাটানোর গল্প।
বিদেশ ভ্রমণের পরিকল্পনা করার সময় অনেক জায়গাই সুন্দর লাগে। ছবি দেখে মনে হয়, সেখানে গেলেই হয়তো স্বপ্নের মতো কিছু মুহূর্ত অপেক্ষা করছে। কিন্তু কোনো জায়গাকে সত্যিকার অর্থে চেনা যায় সেখানে যাওয়ার পর। মানুষের চলাফেরা, ব্যস্ততা, খাবারের স্বাদ, সমুদ্রের মুগ্ধতা—সব মিলিয়ে তৈরি হয় ভ্রমণের নিজস্ব গল্প।
মিতুর কাছে বিদেশ ভ্রমণ নতুন কোনো অভিজ্ঞতা নয়। এর আগে দুই-তিনবার থাইল্যান্ড ভ্রমণ করেছেন তিনি। বোন ডা. ফারহা তাজনিনের সঙ্গে এশিয়ার কয়েকটি দেশ ঘোরার অভিজ্ঞতাও রয়েছে তাঁর। মায়ের সঙ্গে মালয়েশিয়া ও সিঙ্গাপুরের মতো দেশেও ভ্রমণ করেছেন। ফলে নতুন দেশ দেখা কিংবা বিদেশের পরিবেশের সঙ্গে পরিচিত হওয়া তাঁর কাছে বেশ পরিচিত অভিজ্ঞতা।
তবে এবারের থাইল্যান্ড সফরটি ছিল একেবারেই আলাদা। কারণ, এবার শুধু মা কিংবা বোন নয়, পরিবারের সবাইকে সঙ্গে পেয়েছেন মিতু। বাবা, মা, বোন ডা. ফারহা তাজনিন এবং ছোট ভাইকে নিয়ে সাত দিনের এই ভ্রমণ তাঁর কাছে হয়ে উঠেছে জীবনের অন্যতম আনন্দময় ও স্মরণীয় অভিজ্ঞতা।
এর পেছনে রয়েছে বিশেষ একটি কারণ। মিতুর বাবা প্রতিরক্ষা বিভাগে কর্মরত। পেশাগত দায়িত্ব ও ব্যস্ততার কারণে সব সময় পরিবারের সঙ্গে ছুটি কাটানোর সুযোগ তাঁর হয়ে ওঠে না। অন্যদিকে মা একজন চাকরিজীবী । বোন ডা. ফারহা তাজনিনের চিকিৎসকজীবনেও রয়েছে নিয়মিত দায়িত্ব ও ব্যস্ততা। পরিবারের প্রত্যেকের নিজস্ব কর্মজীবন ও দায়িত্বের মধ্যেও এবার সবাই একসঙ্গে সময় বের করে ভ্রমণে যেতে পেরেছেন। তাই এবারের আনন্দ ছিল অন্য সব ভ্রমণের চেয়ে আলাদা।
ঢাকা থেকে ব্যাংকক, তারপর ফুকেট
২২ অক্টোবর দুপুরে ঢাকা থেকে ইউএস-বাংলা এয়ারলাইনসের বিমানে পরিবারের সদস্যদের নিয়ে যাত্রা শুরু করেন মিতু। বিমানে ওঠার পর থেকেই সবার মধ্যে ছিল নতুন জায়গা দেখার উচ্ছ্বাস। বিশেষ করে ছোট ভাইয়ের হাসি, কৌতূহল আর নানা আনন্দময় মুহূর্ত বিমানের দীর্ঘ যাত্রাকেও করে তোলে উপভোগ্য।
ঢাকা থেকে ব্যাংকক পৌঁছে সন্ধ্যায় আরেকটি বিমানে ফুকেট যাওয়ার পরিকল্পনা ছিল। মাঝখানে ব্যাংকক বিমানবন্দরে প্রায় ছয় ঘণ্টার অপেক্ষা। দীর্ঘ অপেক্ষার পর রাতের দিকে ফুকেটে পৌঁছান তাঁরা।
নতুন শহরে প্রথম রাতের অনুভূতিই আলাদা। হোটেলে গিয়ে কিছুটা বিশ্রাম নিয়ে বেরিয়ে পড়েন পাতং বিচের দিকে। রাতের পাতং যেন অন্য এক জগৎ। সমুদ্রের পাশের রাস্তা, পর্যটকদের ভিড়, আলোকসজ্জা আর নানা দেশের মানুষের আনাগোনায় জায়গাটি বেশ প্রাণবন্ত। এরপর ঘুরে দেখেন বাংলা ওয়াকিং স্ট্রিট। সব মিলিয়ে ফুকেটের প্রথম পরিচয়টা ছিল বেশ জমজমাট।

ফুকেটের পুরোনো শহর ও সমুদ্রের সৌন্দর্য
পরদিন সকালে তাঁদের গন্তব্য ছিল বিগ বুদ্ধা মন্দির। পাহাড়ের ওপর অবস্থিত এই স্থাপনা এবং আশপাশের প্রাকৃতিক পরিবেশ ভালো লাগে পরিবারের সবার। এরপর যান কারন বিচের দিকে। সমুদ্রের নীল জলরাশি আর পাহাড়ঘেরা পরিবেশে কিছু সময় কাটান তাঁরা।
দুপুরে যান ফুকেট ওল্ড টাউনে। পুরো ভ্রমণে জায়গাটি মিতুর সবচেয়ে ভালো লাগা স্থানগুলোর একটি। পুরোনো স্থাপত্য, রঙিন ভবন, সাজানো রাস্তা আর ইউরোপীয় শহরের মতো আবহ—সব মিলিয়ে অন্য রকম পরিবেশ। এখানে হাঁটতে হাঁটতে মনে হচ্ছিল, সমুদ্রসৈকতের পরিচিত ফুকেটের বাইরে আরও একটি শহর লুকিয়ে আছে। পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে ছবি তোলা এবং জায়গাটির স্থাপত্য ও পরিবেশ উপভোগ করার মতো সময়ও পেয়েছেন তাঁরা।
বিকেলের দিকে ওল্ড টাউন থেকে বাসে ফেরিঘাটে যান। সেখান থেকে পরবর্তী গন্তব্য ফি ফি আইল্যান্ড।

ফি ফি আইল্যান্ড: নীল জলের কাছে
ফেরিতে করে ফি ফি আইল্যান্ডে পৌঁছান বিকেলের দিকে। দ্বীপে নেমেই পরিবেশের পরিবর্তন চোখে পড়ে। ফুকেটের তুলনায় এখানকার ব্যস্ততা অনেকটাই কম। ছোট দ্বীপের পথ ধরে হেঁটেই বিভিন্ন জায়গায় যাওয়া যায়।
হোটেলে ব্যাগ রেখে সন্ধ্যায় বেরিয়ে পড়েন দ্বীপের উত্তর পাশের সৈকতে। সমুদ্রের পাশে সময় কাটানো, চারপাশের পরিবেশ দেখা আর ছোট ছোট রাস্তা ধরে হাঁটতে হাঁটতে দ্বীপটিকে চেনার চেষ্টা—প্রথম সন্ধ্যাটা এভাবেই কেটে যায়।
ফি ফি আইল্যান্ডের সবচেয়ে আকর্ষণীয় অভিজ্ঞতা ছিল পরদিনের স্পিডবোট ভ্রমণ। একদিনে কয়েকটি দ্বীপ ও সমুদ্রের বিখ্যাত জায়গা ঘুরে দেখার সুযোগ হয়। এর মধ্যে ছিল মায়া বে, বাঁশ দ্বীপ ও মাঙ্কি বিচ। প্রতিটি জায়গার সৌন্দর্য আলাদা। কোথাও সাদা বালুর সৈকত, কোথাও পাহাড়ের মাঝখানে সবুজাভ নীল জলরাশি, আবার কোথাও পাথুরে পাহাড়ের গায়ে সমুদ্রের ঢেউ এসে আছড়ে পড়ছে।
মায়া বে-র কাছে স্নরকেলিংয়ের অভিজ্ঞতাও ছিল বিশেষ। নির্ধারিত অগভীর পানির একটি জায়গায় স্পিডবোট থামে। সেখান থেকে পানিতে নেমে মুখে স্নরকেলিংয়ের সরঞ্জাম লাগিয়ে পানির নিচের জগৎ দেখার চেষ্টা করেন মিতু। প্রথমে কিছুটা অস্বস্তি থাকলেও পরে পানির নিচে তাকিয়ে থাকতে ভালোই লাগছিল। এই অভিজ্ঞতা ভ্রমণের স্মৃতিতে আলাদা জায়গা করে নেয়।

ফি ফি থেকে ক্রাবি: একটু শান্তির খোঁজে
ফি ফি আইল্যান্ডে দুই রাত কাটিয়ে সকালে ফেরিতে ক্রাবির উদ্দেশে রওনা হন তাঁরা। প্রায় দুপুরের দিকে পৌঁছে হোটেলে যান। কিছুটা বিশ্রাম নিয়ে বিকেলে বের হন আও নাং বিচে।
ফুকেটের তুলনায় ক্রাবির এই অংশে পরিবেশ তাঁদের কাছে অনেক শান্ত মনে হয়েছে। রাস্তার কোলাহল ও গাড়ির হর্নের চাপও তুলনামূলক কম। সমুদ্রের পাশে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে সময় কাটানো, গল্প করা এবং চারপাশের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগ করাই ছিল এই পর্বের মূল আনন্দ।
সন্ধ্যায় ঘুরে দেখেন কাছের রাতের বাজার। স্থানীয় খাবারের স্বাদ নেওয়ার পাশাপাশি বাজারের পরিবেশ উপভোগ করেন। আশপাশে মুসলিম সংস্কৃতির উপস্থিতিও চোখে পড়ে। অল্প সময়ের এই অবস্থানেই ক্রাবির প্রতি একধরনের ভালো লাগা তৈরি হয়।

ব্যাংকক: আধুনিক শহর, নদীর পাড় আর চায়নাটাউন
ক্রাবি থেকে সকালে বিমানে ব্যাংককে পৌঁছে হোটেলে ওঠেন তাঁরা। এরপর থাইল্যান্ডের রাজধানীকে দেখার পালা। ব্যাংকক ফুকেট বা ক্রাবির মতো নয়। এখানে মানুষের ব্যস্ততা, যানবাহন, উঁচু ভবন আর বড় বড় বিপণিবিতান—সবকিছুতেই বড় শহরের ছাপ।
সন্ধ্যায় যান আইকনসিয়ামে। চাও ফ্রায়া নদীর পাশে অবস্থিত এই বিশাল বিপণিবিতানের স্থাপত্য ও ভেতরের পরিবেশও দেখার মতো। নদীর পাড়ের পরিবেশ উপভোগ করার পর যান চায়নাটাউনে। সন্ধ্যার পর চায়নাটাউন যেন আরও প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে। রাস্তার দুই পাশে খাবারের দোকান, মানুষের ভিড় আর নানা ধরনের খাবারের ঘ্রাণ—সব মিলিয়ে জায়গাটি বেশ আকর্ষণীয়।
ব্যাংককে পরের দিনটির বড় অংশ ছিল কেনাকাটার জন্য। ঘুরেছেন বিগ সি, ইনদ্রা মার্কেট ও আশপাশের কেনাকাটার এলাকায়। বিগ সিতে খাবার, হালকা নাশতা, প্রসাধনসামগ্রী ও ঘরোয়া ব্যবহার্য নানা পণ্য পাওয়া যায়। দেশে ফেরার আগে পরিচিতদের জন্য উপহার কেনার ক্ষেত্রেও জায়গাটি বেশ কাজে লাগে। অন্যদিকে ইনদ্রা মার্কেট ও আশপাশের দোকানগুলোতে পোশাক, জুতা ও ফ্যাশনসামগ্রীর বৈচিত্র্য রয়েছে। একাধিক দোকানে ঘুরে পণ্যের মান ও দাম তুলনা করার সুযোগ পান তাঁরা।

পরিচিত গন্তব্য, কিন্তু আনন্দের কারণ ছিল ভিন্ন
মিতুর কাছে থাইল্যান্ড নতুন কোনো দেশ নয়। আগেও দুই-তিনবার এই দেশ ভ্রমণ করেছেন তিনি। বোন ডা. ফারহা তাজনিনের সঙ্গে এশিয়ার বিভিন্ন জায়গায় ঘোরার অভিজ্ঞতা রয়েছে। মায়ের সঙ্গে মালয়েশিয়া ও সিঙ্গাপুর ভ্রমণের স্মৃতিও আছে। তবু এবারের সফরটি আগের সব অভিজ্ঞতা থেকে আলাদা হয়ে থাকবে।
কারণ, এবার পরিবারের কোনো সদস্যই বাদ পড়েননি। বাবা, মা, বোন ও ছোট ভাই—সবাই ছিলেন একই যাত্রার সঙ্গী। বাবার পেশাগত দায়িত্বের কারণে পরিবারের সবাইকে নিয়ে একসঙ্গে বিদেশ ভ্রমণের সুযোগ সব সময় তৈরি হয় না। প্রতিরক্ষা বিভাগে কর্মরত বাবার কাজের ব্যস্ততা ও ছুটির সীমাবদ্ধতার কারণে এমন একটি পারিবারিক সফরের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করাও সহজ ছিল না।
অন্যদিকে মা ব্যাংক ম্যানেজার হিসেবে নিজের কর্মক্ষেত্রের দায়িত্ব পালন করেন। বোন ডা. ফারহা তাজনিনের চিকিৎসকজীবনের ব্যস্ততাও রয়েছে। এত কিছুর মধ্যেও সবাই যখন একসঙ্গে সময় বের করে বিদেশ ভ্রমণে যেতে পেরেছেন, তখন আনন্দের মাত্রাটাও ছিল অন্য রকম।
বিমানে ছোট ভাইয়ের হাসি, নতুন জায়গা দেখে তার উচ্ছ্বাস, বোনের সঙ্গে ঘোরাঘুরি, মায়ের সঙ্গ এবং বাবাকে পাশে পাওয়ার অনুভূতি—সব মিলিয়ে ভ্রমণের প্রতিটি দিন হয়ে ওঠে বিশেষ। মিতুর কাছে সমুদ্র, পাহাড় কিংবা সুন্দর পর্যটনকেন্দ্রের পাশাপাশি পরিবারের সঙ্গে কাটানো এই মুহূর্তগুলোই ছিল সবচেয়ে মূল্যবান।

সাত দিনের ভ্রমণ শেষে
ব্যাংককে শেষ সময়টুকু কাটিয়ে দেশে ফেরার প্রস্তুতি নেন তাঁরা। সাত দিনের এই ভ্রমণে চারটি জায়গা দেখেছেন, কিন্তু প্রতিটি জায়গা থেকে পাওয়া অভিজ্ঞতা ছিল আলাদা।
ফুকেট শিখিয়েছে সমুদ্রের পাশেও একটি পুরোনো শহরের গল্প থাকতে পারে। ফি ফি আইল্যান্ড দেখিয়েছে প্রকৃতির সৌন্দর্য কতটা কাছ থেকে অনুভব করা যায়। ক্রাবি দিয়েছে প্রশান্তি। আর ব্যাংকক দেখিয়েছে আধুনিক শহরের ব্যস্ততা ও কেনাকাটার বিশাল জগৎ।
আগেও অনেক দেশ দেখা হয়েছে, ভবিষ্যতেও হয়তো আরও নতুন গন্তব্যে যাওয়ার সুযোগ হবে। কিন্তু এবারের ভ্রমণটি মিতুর কাছে বিশেষ হয়ে থাকবে একটি কারণে—এই প্রথম পরিবারের সবাইকে একসঙ্গে নিয়ে এমন একটি বিদেশ সফর উপভোগ করেছেন তিনি।
মিতু ইসলাম মিমের বোন ডা. ফারহা তাজনিন পড়াশোনার জন্য কয়েক বছর দেশের বাইরে ছিলেন। সেই সুবাদে তাঁর ঝুলিতে জমা হয়েছে নানা দেশ ভ্রমণের অভিজ্ঞতা ও অসংখ্য স্মৃতি। এবারের ভ্রমণে পরিবারের সবাইকে একসঙ্গে পাওয়াটা ছিল সত্যিই বিশেষ আনন্দের। ডা. ফারহা তাজনিনের ভ্রমণের গল্পও নিশ্চয়ই বেশ সমৃদ্ধ। কে জানে, কোনো একদিন হয়তো তাঁর মুখ থেকেই শোনা যাবে দেশ-বিদেশের নানা অভিজ্ঞতা, অজানা গল্প আর রোমাঞ্চকর ভ্রমণকাহিনি। সেই অপেক্ষায় রইলাম।
ভ্রমণের আনন্দ শুধু নতুন দেশ দেখা কিংবা সুন্দর জায়গায় ছবি তোলার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। কখনো কখনো একটি ভ্রমণ হয়ে ওঠে পরিবারের মানুষগুলোকে আরও কাছ থেকে অনুভব করার উপলক্ষ। প্রতিদিনের ব্যস্ততা পেরিয়ে একসঙ্গে কাটানো কিছু দিন, ছোট ভাইয়ের হাসি, বোনের সঙ্গ, মায়ের উপস্থিতি আর বাবাকে পাশে পাওয়ার আনন্দ—এসবই শেষ পর্যন্ত ভ্রমণের সবচেয়ে মূল্যবান স্মৃতি হয়ে থাকে।
থাইল্যান্ডের নীল সমুদ্র, ফুকেট ওল্ড টাউনের রঙিন ভবন, ক্রাবির শান্ত সন্ধ্যা কিংবা ব্যাংককের চায়নাটাউনের ব্যস্ত রাস্তা—সব মিলিয়ে এই সফর মিতু ইসলাম মিমের জীবনের অন্যতম আনন্দময় অধ্যায়। অনেকবার থাইল্যান্ড যাওয়া হলেও এবারের ভ্রমণটি তাঁর কাছে আলাদা, কারণ এবার গন্তব্যের সৌন্দর্যের চেয়েও বড় আনন্দ ছিল পরিবারের সবাইকে একসঙ্গে পাওয়া।








