
জয় বাংলা স্লোগান ঘিরে ক্ষমতাসীন দল ও পুলিশের কর্মকাণ্ড দেখে আমার মাতামহের কাছে শোনা গল্পটি মনে পড়ছে। তিনি বামপন্থি রাজনীতি করতেন। তাদের কাছে মস্কো ছিল ধ্রুবতারার মতো। বহুবার তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নে গিয়েছিলেন তিনি। তাঁর ঝুলিতে ছিল রাশিয়া সম্পর্কিত অসংখ্য গল্প, বিশেষত ১৯১৭ সালের বলশেভিক বিপ্লব-পরবর্তী পরিস্থিতি নিয়ে। সেই গল্পেও দেখা যায়, বিপ্লবের পরপর বিপ্লবীদের পাশাপাশি বহু মানুষ পাড়ায় পাড়ায় ‘বুর্জোয়া’ খুঁজতে নেমে পড়েন। বিপ্লবের নেতাদের কাছ থেকে তারা শুনেছিলেন, ক্ষমতাচ্যুত সরকার ছিল বুর্জোয়া শ্রেণিভুক্ত। অতএব বিপ্লব টিকিয়ে রাখতে হলে বুর্জোয়াদের খতম করতে হবে। কিন্তু অতিউৎসাহী ওইসব মানুষ জানতেন না, বুর্জোয়া কাদের বলে। স্থানীয় নেতারাও তখন ধন্দ্বে পড়ে গেলেন। তবে পাছে বিপ্লবী চেতনা থিতিয়ে যায়– এই ভয়ে তারা দ্রুতই ফতোয়া দিলেন, যাদের ‘সেলার’-এ মাংস পাওয়া যাবে তারাই বুর্জোয়া। বিশ শতকের শুরুতে তো আর ফ্রিজ ছিল না, তাই রাশিয়ার মতো বরফের দেশে মাটির নিচে খাদ্য বা পানীয় সংরক্ষণের জন্য ঘর বানানো হতো, রাশিয়ান ভাষায় যাকে বলা হতো ‘পোগ্রেব’, আর ইংরেজিতে সেলার। বলা বাহুল্য, কেবল সচ্ছল পরিবারেরই এমন সেলার তৈরির সামর্থ্য ছিল।
সেই গল্পের চরিত্রদের মতোই চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত এবং বর্তমানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের বিশেষত কর্মী-সমর্থক খোঁজার নামে ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মী ও পুলিশ অদ্ভুত কিছু কাণ্ড ঘটাচ্ছে। বর্তমানে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় তো বটেই, জেলা-উপজেলা, এমনকি ইউনিয়ন বা ওয়ার্ড পর্যায়েরও পদধারী নেতারা হয় কারাগারে, নয় তো দেশের বাইরে। তারপরও মাঝে মাঝে দলটির নামে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জেলা-উপজেলায় মিছিল বের হতে দেখে বিএনপির নেতাকর্মীদের সঙ্গে পুলিশ বেশ পেরেশানিতে পড়ে গেছে বলে মনে হচ্ছে। রাস্তায় এত লোকের ভিড়ে দলটির ‘দোসর’ চিহ্নিত করতে গিয়ে সেই অতিউৎসাহী রুশিদের মতো তারাও একটা বৈশিষ্ট্য ঠিক করে ফেলেছেন। সেটা হলো, কোনো অনুষ্ঠানে বা রাস্তার কর্মসূচিতে যারাই ‘জয় বাংলা’ স্লোগান দেবে তারাই আওয়ামী লীগ। অতএব কারও কোনো যুক্তি বা বক্তব্যে কান না দিয়ে ধরো ওই স্লোগান উচ্চারণকারীদের।
এই সূত্র অনুসরণ করতে গিয়ে ইতোমধ্যে অনেক আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীর জানাজার নামাজও নির্বিঘ্ন হতে পারছে না। যেমন, গত ১ জুন দীর্ঘ রোগভোগের পর ঢাকায় এক হাসপাতালে মারা গেলেন ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানের অন্যতম নায়ক, আওয়ামী লীগ নেতা ও সাবেক মন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ। ওই দিনই সন্ধ্যায় তাঁর জানাজা ছিল ধানমন্ডির তাকওয়া মসজিদ প্রাঙ্গণে। কোনো ঘোষণা ছিল না, তবুও প্রচুর মানুষ জড়ো হন সেখানে। জানাজা শেষে কিছু মানুষ আবেগে জয় বাংলা স্লোগান দেন। আর অমনি পুলিশ ঝাঁপিয়ে পড়ে কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করে। সাংবাদিকরা গ্রেপ্তারের কারণ জিজ্ঞেস করলে পুলিশের উত্তর ছিল– যেহেতু ‘জয় বাংলা’ বলেছে, অতএব এরা আওয়ামী লীগের লোক, তাই গ্রেপ্তারযোগ্য।
সম্ভবত একই আতঙ্ক থেকে গত ১১ অক্টোবর ওই একই স্থানে ছাত্রলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক মাহফুজুল হায়দার চৌধুরী রোটনের জানাজাই হতে দেয়নি পুলিশ। রোটন আগের দিন শনিবার ভারতের কলকাতায় ক্যান্সারে মৃত্যুবরণ করেন।
এমনকি ভিন্ন দলের কর্মসূচিও এ আতঙ্ক থেকে রেহাই পাচ্ছে না। গত ২৬ সেপ্টেম্বর দুপুরে রাজধানীর গুলিস্তানে জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল-জাসদের (ইনু) কার্যালয়ে দলটির এক প্রতিনিধি সম্মেলনে হামলা চালায় যুবদল ঢাকা দক্ষিণের সাধারণ সম্পাদকের নেতৃত্বে এক দল যুবক। শুধু তাই নয়; তাদের ডাকে সাড়া দিয়ে পল্টন থানার পুলিশ রীতিমতো তুলে নিয়ে যায় তিন শতাধিক জাসদ নেতাকর্মীকে। পল্টন থানার পরিদর্শকের বাংলা ট্রিবিউনকে দেওয়া বক্তব্য অনুসারে, যুবদলের নেতাকর্মীরা দাবি করছেন– জাসদ কার্যালয়ের ভেতর থেকে জয় বাংলা স্লোগান দেওয়া হয়েছে।
বিগত দুই দশকের বেশি সময় আওয়ামী লীগের সঙ্গে জোটবদ্ধ হয়ে আন্দোলন ও সরকার গঠন করায় জাসদের গায়ে হয়তো আওয়ামী লীগের গন্ধ লেগে আছে। কিন্তু গত সোমবার ছাত্র ইউনিয়নের সাবেক নেতাকর্মীদেরও নিরীহ কর্মসূচি একইভাবে পণ্ড করে দেওয়া হয়, যাদের অনেকে বিগত সময়ে শুধু আওয়ামী লীগের বিরোধিতাই করেননি; সরকার পতন আন্দোলনেও সক্রিয় ছিলেন। সেখানেও ‘জয় বাংলা’ স্লোগান দেওয়ার অভিযোগে ছাত্র ইউনিয়নের সাবেক সাধারণ সম্পাদক দীপক শীলকে আটক করা হয়। এমনকি ওইদিন রাতেই সতীর্থদের চাপে মুক্তি পাওয়া দীপক শীলকে নিয়ে পল্টনে সিপিবি বা কমিউনিস্ট পার্টির একদল কর্মী মিছিল করলে সেখানেও হামলা চলে। সিপিবি চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের অন্যতম শরিক দল হলেও দলটির সাবেক সাধারণ সম্পাদক রুহিন হোসেনের অভিযোগ, ক্ষমতাসীন দলের লোকেরা দলটির কার্যালয়েও হামলা চালায়। সেখানেও অজুহাত ওই একই– মিছিল থেকে জয় বাংলা স্লোগান দেওয়া হয়েছে (নিউ এজ, ২৭ অক্টোবর, ২০২৬)।
মজার ব্যাপার হলো, পরদিন, ২৭ অক্টোবর সিপিবির মিছিলে হামলার ব্যাপারে রাজধানীতেই একটি অনুষ্ঠানে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভীকে সাংবাদিকরা প্রশ্ন করেন। ওই দিন এনটিভিতে প্রচারিত এক খবরে রিজভী সিপিবি গণঅভ্যুত্থানের পর থেকে এ পর্যন্ত আওয়ামী লীগের ‘পুনর্বাসনে’ কোনো কাজ করেছে– এমন কিছু শোনেননি জানিয়ে সিপিবিকে পরামর্শ দেন; এমন কোনো স্লোগান দেওয়া বা কাজ করা তাদের উচিত হবে না, যাতে ‘পতিত ফ্যাসিবাদ উৎসাহিত হয়।’
স্পষ্টত, জয় বাংলা নিয়ে সরকার ও তার দল বেশ অস্বস্তিতে, যদিও স্লোগানটি ছিল মুক্তিযুদ্ধের রণধ্বনি, যা পাকিস্তানি হানাদার ও তার দোসরদের বুকে কাঁপন ধরাত। সম্ভবত কবি কাজী নজরুল ইসলামের ‘পূর্ণ-অভিনন্দন’ কবিতা থেকে নিয়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও তাঁর অনুসারীরা ‘জয় বাংলা’ শব্দবন্ধকে স্লোগানে পরিণত করেন। ১৯৭২ সাল থেকে আওয়ামী লীগই তাকে দলীয় স্লোগান হিসেবে ব্যবহার করে আসছে। তবে, মুক্তিযুদ্ধের সর্বজনীন স্লোগানটি একটা দল ব্যবহার করে আসছে বলে সেটা ওই দলের সম্পত্তি হয়ে যায়নি।
প্রশ্ন হলো, জাতীয়তাবাদী আবেগসমৃদ্ধ একটা স্লোগান থেকে কি এখনও শোষণ-বঞ্চনা এবং বিদেশি নানা ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে সংগ্রামরত একটা জাতিকে দূরে রাখা সংগত? অন্তত ভিন্নমত ও দর্শনের প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শনের অংশ হিসেবেও গণঅভ্যুত্থানের পর অন্তর্ভুক্তিমূলক রাষ্ট্র ও সমাজ প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার নিয়ে গঠিত সরকার স্লোগানটির চর্চা বন্ধ করতে পারে না।
লক্ষণীয়, আজকে জয় বাংলা নিয়ে জনপরিসরে যতটা আগ্রহ দেখা যায়, তা কিন্তু ২০২২ সালে হাইকোর্টের এক নির্দেশের পর সরকার ‘জয় বাংলা’কে জাতীয় স্লোগান হিসেবে ঘোষণা করলে দেখা যায়নি। যারা ভেবেছিলেন, ক্ষমতা থেকে আওয়ামী লীগের বিদায়ের পর স্লোগানটিরও মৃত্যু ঘটবে; সম্ভবত যে ভাবনা থেকে ড. ইউনূস ভয়েস অব আমেরিকার সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে রিসেট বাটন চাপার কথা বলেছিলেন, তারা ইতোমধ্যে ভুল প্রমাণিত হয়েছেন।
মানতেই হবে যে, আওয়ামী লীগ প্রাসঙ্গিক হওয়ার পেছনে তার জয় বাংলা স্লোগান ধরে রাখার যতটুকু অবদান, তার চেয়ে বেশি অবদান জনগণের কাছে মহামূল্যবান মুক্তিযুদ্ধের অন্য কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের মতো স্লোগানটিকেও ধামাচাপা দেওয়ার শাসকীয় অপচেষ্টার। জয় বাংলা নিয়ে আতঙ্ক যেমন অর্থহীন, তেমনি এর বিরুদ্ধে আক্রোশও বুমেরাং হতে বাধ্য।






