
মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ ও জাতীয়তাবাদকে ধারণ করে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষায় কাজ করার আহ্বান জানিয়েছেন মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ও ঢাকা-৬ আসনের সংসদ সদস্য ইশরাক হোসেন।
তিনি বলেন, বাংলাদেশের ভিত্তি ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ। দেশকে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে ধরে রাখতে হলে মুক্তিযুদ্ধকে জীবনের প্রত্যেক স্তরে ধারণ করার কোনো বিকল্প নেই।
সোমবার (২১ সেপ্টেম্বর) জাতীয় প্রেসক্লাবের জহুর হোসেন চৌধুরী হলে ‘বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী মুক্তিযুদ্ধের প্রজন্ম’ আয়োজিত আলোচনা সভায় তিনি এসব কথা বলেন।
‘স্বাধীনতার সার্বভৌমত্ব, রাষ্ট্রীয় অখণ্ডতা ও জাতীয়তাবাদের চেতনা জাগ্রত রাখাই আমাদের অঙ্গীকার’ প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে চলমান সমসাময়িক প্রেক্ষাপটে করণীয় নির্ধারণে এ আলোচনা সভার আয়োজন করা হয়।
অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী মুক্তিযুদ্ধের প্রজন্ম দলের মহানগর কমিটি ঘোষণা করা হয়। নতুন কমিটির সদস্যদের উদ্দেশে ইশরাক হোসেন বলেন, তাদের ওপর যে গুরুদায়িত্ব দেওয়া হয়েছে, তা নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করতে হবে। তিন মাসের জন্য আহ্বায়ক কমিটি করা হচ্ছে। পরবর্তী সময়ে কাউন্সিলের মাধ্যমে পূর্ণাঙ্গ কমিটি ঘোষণা করা হবে।
ইশরাক বলেন, বিএনপি গণতন্ত্রে বিশ্বাসী। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান একদলীয় শাসনব্যবস্থা উৎখাত করে বহুদলীয় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। সেই ধারাবাহিকতায় বিএনপির প্রত্যেকটি কমিটি কাউন্সিলের মাধ্যমে গঠনের চর্চা করা হবে।
তিনি বলেন, মুক্তিযোদ্ধারা চিরকাল থাকবেন না, কোনো মানুষই চিরকাল বেঁচে থাকেন না। তবে, বাংলাদেশের মূল ভিত্তি ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ। সেই মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে বাংলাদেশ স্বাধীন রাষ্ট্র, স্বাধীন পতাকা, স্বাধীন ভূখণ্ড ও স্বাধীন পরিচয় পেয়েছে। এই পরিচয় ধরে রাখতে এবং ভবিষ্যতে যে-কোনো বহির্বিশ্বের ষড়যন্ত্র থেকে দেশকে মুক্ত রাখতে মুক্তিযুদ্ধকে মনে-প্রাণে ধারণ করতে হবে
ইশরাক বলেন, ১৯৭১ সালে যারা মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা করেছিল, তারা এখন বিরোধী দলের আসনে এসেছে। জনগণের নির্বাচনের মাধ্যমে তারা সংসদে কিছু আসন পেয়েছে, তাই তাদের সেই সম্মান দিতে হবে। তবে মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতার বিষয়টি ইতিহাসের সত্য হিসেবে স্বীকার করেই তাদের রাজনীতি করতে হবে। জনগণ নির্ধারণ করবে তারা তাদের কতটুকু গ্রহণ করবে।
তিনি বলেন, ২০২৪ সালের রক্তাক্ত গণ–অভ্যুত্থান মুক্তিযুদ্ধের প্রেরণা থেকেই দীর্ঘ সাড়ে ১৭ বছরের আন্দোলন-সংগ্রামের চূড়ান্ত ফলাফল। আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস মুছে ফেলার চেষ্টা করা হয়েছিল বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
তার ভাষ্য, আগামী দিনে মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ প্রতিষ্ঠা করা বাংলাদেশের অস্তিত্বের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কাজ।
সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে ইশরাক বলেন, গণহত্যার সঙ্গে জড়িত কয়েকজনের মৃত্যুদণ্ডের রায়কে কেন্দ্র করে আওয়ামী লীগের কয়েকজন নেতা-কর্মী বাংলাদেশে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে রাজনৈতিক অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার চেষ্টা করছে। একই সময়ে বাংলাদেশের স্থিতিশীলতা নষ্ট করতে অন্য একটি পক্ষও কাজ করছে বলে তিনি মন্তব্য করেন।
নতুন রাজনৈতিক দলগুলোর প্রসঙ্গে ইশরাক বলেন, একসময় তারা সবাই আওয়ামী লীগ বিরোধী আন্দোলনে একসঙ্গে ছিলেন। তবে বর্তমানে তাদের বক্তব্য ও ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। বিএনপির দীর্ঘ আন্দোলন-সংগ্রামে নেতা-কর্মীদের গুম, খুন, পঙ্গুত্ব ও কারাবরণের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, রাজনীতিতে জনগণের মাটি ও মানুষের অনুভূতি বুঝতে হবে।
ইশরাক বলেন, ২০২৪ সালের আন্দোলনের আগে দীর্ঘ ১৭ বছর বিএনপি রাজপথে আন্দোলন-সংগ্রাম করেছে। জনগণের মধ্যে দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ একসময় বিস্ফোরিত হতোই। বিভিন্ন সময়ে কৌশল পরিবর্তন করলেও বিএনপি আন্দোলন চালিয়ে গেছে।
রাষ্ট্রীয় বাহিনীর ভূমিকা প্রসঙ্গে ইশরাক বলেন, বিএনপি কখনো রাষ্ট্রীয় বাহিনী নির্ভর রাজনৈতিক দল ছিল না। পুলিশ কী করল, সেটি তাদের দেখার বিষয় নয়। তারা নিজেদের রাজনৈতিক কাজ করে যাবেন। দীর্ঘ ১৭ বছরের আন্দোলন-সংগ্রামের মাধ্যমে তারা দেশে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করেছেন।
তিনি বলেন, দীর্ঘদিনের দলীয়করণের কারণে প্রশাসনের বিভিন্ন জায়গায় আগের লোকজনই রয়েছেন। তাদের দায়িত্ব পালনে বাধ্য করতে হবে। ৫ আগস্টের পর থানাগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, বিএনপি নেতা-কর্মীরা থানাগুলোতে গিয়ে পুলিশকে বসিয়ে দিয়েছেন এবং তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করেছেন।
ইশরাক বলেন, এসব বিষয়ে কাজ চলছে, তবে রাতারাতি সমস্যার সমাধান করা সম্ভব নয়। সরকার পরিচালনার দায়িত্বে তারা সবসময় নাও থাকতে পারেন। তবে জনগণের সঙ্গে তাদের যে সম্পর্ক এবং যে রাজনীতির মাধ্যমে তাদের অবস্থান তৈরি হয়েছে, সেটি আরও সুদৃঢ় করতে হবে।
তিনি বলেন, আগামী কয়েক সপ্তাহ রাজপথে আগের আন্দোলন-সংগ্রামের মতো কঠোর অবস্থানে থাকতে হবে। তবে কোনো হামলা, নৈরাজ্য বা সন্ত্রাস নয়, জনগণকে সঙ্গে নিয়ে বাংলাদেশের নিরাপত্তা, জনগণের নিরাপত্তা এবং জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।
ইশরাক বলেন, ঢাকা মহানগর দক্ষিণ বিএনপির কর্মসূচি হয়েছে। সংসদীয় নির্বাচনী এলাকাগুলোতেও স্থানীয়ভাবে কাজ শুরু হয়েছে। প্রজন্ম দলের নতুন কমিটির নেতাদের দলের নির্দেশনা অনুযায়ী কর্মসূচি হাতে নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
তিনি বলেন, বিএনপির চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রতিটি নির্দেশনা অক্ষরে অক্ষরে পালন করতে হবে। তার ভাষায়, তারেক রহমানের হাতকে শক্তিশালী করতে হবে এবং তার নির্দেশনা বাস্তবায়নের মাধ্যমে বিএনপি, অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠন এবং প্রজন্ম দলকে শক্তিশালী করতে হবে। এটি ক্ষমতায় থাকার জন্য নয়, বাংলাদেশের অস্তিত্ব রক্ষার জন্য করতে হবে।
ইশরাক আরও বলেন, বাংলাদেশের ভূখণ্ড নিয়ে আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক রাজনীতিতে বিভিন্ন ধরনের ষড়যন্ত্র চলছে। পার্বত্য চট্টগ্রাম ও মিয়ানমার সীমান্তের ঘটনাগুলোর দিকেও নজর রাখতে হবে। বিশ্ব রাজনীতির এসব বিষয় মাথায় রেখে আগামী দিনে কাজ করার আহ্বান জানান তিনি।
অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী মুক্তিযোদ্ধা দলের সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা ইশতিয়াক আজিজ উলফাত এবং মুক্তিযুদ্ধের প্রজন্ম দলের সাধারণ সম্পাদক ড. কে এম আই মন্টি উপস্থিত ছিলেন।







