‘আগে নদীর ঢেউ ঘরে আঘাত করত, মাটি ভেঙে যেত। এখন মুর্তা ও উজাউড়া লাগানোর পর তীর আগের মতো ভাঙে না। শীতল পাটি বুনে বিক্রি করে কিছু অতিরিক্ত আয়ও করতে পারি,’ সুনামগঞ্জের তাহিরপুর উপজেলার পুবেরবাড়ি গ্রামে স্থানীয় বাসিন্দা জাহানারা বেগম। সুনামগঞ্জের তাহিরপুর উপজেলার পুবেরবাড়ি গ্রামে বন্যা মৌসুমে ঢেউজনিত ভূমিক্ষয় রোধ ও বিকল্প জীবিকা সৃষ্টিতে প্রকৃতি নির্ভর সমাধান উদ্ভাবন করেছে সেন্টার ফর পিপল এন্ড এনভায়রন নামক একটি সংস্থা। সংস্থাটি দীর্ঘদিন ধরে জলবায়ু সহিষ্ণু উন্নয়ন, জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ ও হাওর ইকোসিস্টেম রক্ষায় কাজ করছে।
জানাগেছে, হাওর অঞ্চলের মানুষের জন্য বন্যা ও ঢেউজনিত ক্ষয় একটি বড় হুমকি। বন্যার সময় তীব্র ঢেউ হাওরের ছোট ছোট দ্বীপগুলোকে ভেঙে বসতভিটা বিলীন করে দেয়। তথ্য বলছে, ২০২২ সালের আকস্মিক বন্যায় প্রায় ৩হাজার ২৩ হেক্টর ভূমি ক্ষয়প্রাপ্ত হয়৷ সেই সময় ৯৩২টি পরিবার বসতভিটা হারায়। এই প্রেক্ষাপটে, সংস্থাটি একসময়ে হাওরে বহুল প্রচিলতি বহুবর্ষজীবী উদ্ভিদ মুর্তা ও উজাউরা ব্যবহার করে ঢেউ ক্ষয় রোধের পাশাপাশি বিকল্প জীবিকা সৃষ্টির এক নতুন মডেল প্রবর্তন করেছে। বর্তমানে হাওরে মূর্তা প্রায় হারিয়ে যেতে বসেছে যা এই কার্যক্রমের মধ্য দিয়ে আবার ফিরে আসার পথ সুগম হয়েছে।
প্রকল্পের আওতায় নারীরা মূর্তা ব্যবহার করে ঐতিহ্যবাহী শীতল পাটি তৈরি করে বিক্রি করছেন, যা নারী, তরুণ ও প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের আয় বৃদ্ধির পাশাপাশি বাংলাদেশের হারিয়ে যাওয়া ঐতিহ্যবাহী শীতলপাটিকে পুনরুদ্ধারে ভূমিকা রাখছে। এই উদ্ভবানী প্রকল্পটিতে অর্থনৈতিক সহায়তা দিয়েছে Adaptation Research Alliance (ARA)। প্রতিষ্ঠানটি এই মডেল উদ্ভাবনের আগে পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, পুবেরবাড়ি গ্রামের ৭৩ শতাংশ পরিবার বর্ষাকালে খাদ্য সংকটে ভুগতো।
মূর্তা-ভিত্তিক জলবায়ু সহিষ্ণু বিকল্প আয়ের সংস্থানের মধ্য দিয়ে তা নেমে এসেছে ৩৮ শতাংশে। ২০২১ সালে মুর্তা ও উজাউড়া রোপণের পর থেকে ভূমিক্ষয়ের হার উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। ২০১৩ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত এই গ্রামটি গড়ে প্রতি বছর ০.৩৩ হেক্টর জমি হারিয়েছিল।
কিন্তু ২০২২ সাল থেকে ক্ষয় কমে বছরে মাত্র ০.০২ হেক্টরে নেমে এসেছে। ঘরবাড়ি, গবাদি পশু ও বসতবাড়ির আঙিনায় কৃষির ক্ষতিও কমেছে।
এই বিষয়ে সংস্থাটির পরিচালক ও প্রধান গবেষক মুহম্মদ আবদুর রহমান বলেন, ‘মুর্তা ও উজাউরা মাটিকে দৃঢ় করে, প্রাকৃতিক ঢেউ প্রতিরোধক হিসেবে কাজ করে এবং পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করে। একই সঙ্গে, এই উদ্ভিদ স্থানীয় শীতলপাটির ঐতিহ্যকে পুনরুজ্জীবিত করছে, যা সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ।’
প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত স্থানীয় যুবক সাদ্দাম হোসেন বলেন, ‘আমরা ভাবিনি আমাদের ঐতিহ্যই একদিন ভূমি রক্ষা করবে এবং জীবিকার পথ খুলে দেবে। এখন মুর্তা শুধু গাছ নয়, এটি আমাদের জীবনের অবলম্বন।’ ৬ নম্বর তাহিরপুর সদর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মো. জনাব আলী বলেন, ‘মুর্তা বিলুপ্ত হওয়ার পর অনেক পাখি, মাছ ও সরীসৃপ হারিয়ে গিয়েছিল। এখন মুর্তা বনে আবার সেগুলোর ফিরে আসছে। তিনি বলেন এই উদ্যোগ হাওরের সর্বত্র চালু করা গেলে ঢেউজনিত ক্ষয় রোধ, আয় সৃষ্টি ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ একসঙ্গে সম্ভব।’
এ প্রসঙ্গে মুহম্মদ আবদুর রহমান বলেন, ‘এখানে আমরা নতুন কিছুই করিনি। দীর্ঘ সময় জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে গবেষণা করতে গিয়ে হওরের এই প্রকৃতি নির্ভর সমাধান নজরে আসে তাই আমরা এটাকে একটি টেকসই মডেলে রুপান্তরের চেষ্টা করেছি। প্রকৃতি-নির্ভর সমাধান তখনই টেকসই হয়, যখন স্থানীয় সম্প্রদায় এর পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নে নেতৃত্ব দেয়। আমরা স্থানীয় জনগণকে বিশেষ করে নারী, যুব ও প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের যুক্ত করার চেষ্টা করেছি। তিনি আরও বলেন খুব অল্প পরিমাণে হলেও এই মডেল কার্বন প্রশমণেও ভূমিকার রাখছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘মুর্তা-ভিত্তিক প্রকৃতি নির্ভর এই মডেলটি স্বল্পব্যয়ী, জলবায়ু পরিবর্তন অভিযোজন ও প্রশমনে কার্যকরী এবং মানুষের জীবীকার সংস্থান করছে তাই এই মডেলটি বন্যা ও জলাবদ্ধতা প্রবণ এলাকায় ভূমিকর ক্ষয়রোধ এবং বিকল্প জীবীকার সংস্থানে সম্প্রসারণ করা যেতে পারে। শুধুমাত্র কংক্রিট বাঁধ ঢেউজনিত ক্ষয় ঠেকাতে যথেষ্ট নয়; প্রকৃতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ সমাধানই দীর্ঘমেয়াদে কার্যকর হবে।’






